আমাদের প্রত্যেকেই জীবনের বিভিন্ন সময়ে গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাই, তবুও আমরা নিজেদের একই ব্যক্তি হিসেবে অনুভব করি, এবং একটি স্থিতিশীল ও সুসংগত আত্মপরিচয়ের অনুভূতি বজায় রাখার এই ক্ষমতা সত্যিই বিস্ময়কর।
জীবনের পথে আমরা শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হই, নতুন জিনিস শিখি, অনেক কিছু ভুলে যাই, নতুন সম্পর্ক তৈরি করি এবং পুরোনো সম্পর্ক হারাই, আর এই সবকিছুই প্রতিদিনের ঘুম ও স্বপ্নের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তবুও এত পরিবর্তনের মাঝেও আমরা নিজেদের একই মানুষ হিসেবে অনুভব করি।
{inAds}
এই অনুভূতির পেছনে মস্তিষ্কের একটি চলমান নির্মাণ প্রক্রিয়া কাজ করে, যা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় এবং ভঙ্গুর। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মৃগী রোগের চিকিৎসার জন্য যাদের মস্তিষ্ক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বিভক্ত করা হয়েছিল, তাদের উপর গবেষণায় কিছু অদ্ভুত ঘটনা দেখা যায়, যেমন কখনো একটি হাত শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে আর অন্য হাত তা খুলে দিচ্ছে।
{inAds}
তবুও তারা নিজেদের একটি ঐক্যবদ্ধ পরিচয় হিসেবে অনুভব করত এবং তাদের অস্বাভাবিক আচরণের ব্যাখ্যা নিজেরাই তৈরি করত, অর্থাৎ মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিকভাবে গল্প তৈরি করে আত্মপরিচয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখত। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও গবেষণায় দেখা গেছে, আমরা সাধারণত সেই স্মৃতিগুলো বেশি মনে রাখি যেগুলো আমাদের নিজের সম্পর্কে ধারণার সঙ্গে মিল থাকে, যেমন আপনি যদি নিজেকে অন্তর্মুখী মনে করেন।
{inAds}
তাহলে সেই ধারণাকে সমর্থন করে এমন স্মৃতিগুলো সহজে মনে পড়বে, এভাবে আমরা নিজের অজান্তেই আমাদের জীবনের গল্প বা আত্মজীবনীকে বর্তমান আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে সাজাই। এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যা কপালের ঠিক পেছনে অবস্থিত, এবং যখন আমরা নিজেদের সম্পর্কে চিন্তা করি বা ভবিষ্যতের নিজের পরিচয় কল্পনা করি, তখন এই অংশটি অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আমাদের আত্মপরিচয়ের অনুভূতি শুধু আমাদের চিন্তা বা স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের নিজের জিনিসপত্রের সঙ্গেও জড়িত, কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, যখন মানুষ তাদের নিজের জিনিস দেখে, তখন মস্তিষ্কের এই একই অংশ সক্রিয় হয়, কিন্তু অপরিচিত জিনিসের ক্ষেত্রে তা হয় না, যা প্রমাণ করে মস্তিষ্ক কত দ্রুত নিজের সীমানা নির্ধারণ করে। স্মৃতিও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষ নিজের অতীত বা ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে না, যা দেখায় আমাদের আত্মপরিচয়ের ধারাবাহিকতা মস্তিষ্কের সক্রিয় কাজের উপর নির্ভরশীল।
{inAds}
মস্তিষ্ক শুধু সময়ের মধ্যে আত্মপরিচয় বজায় রাখে না, বরং স্থানেও বজায় রাখে, যাতে আমরা আমাদের শরীরকে নিজের বলে অনুভব করি, এবং এই কাজে টেম্পোরো–প্যারিয়েটাল জংশন নামের একটি অংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০০৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের সময় এই অংশকে উদ্দীপিত করলে কিছু রোগী নিজেদের শরীরের বাইরে ভাসছে বলে অনুভব করেন, যা প্রমাণ করে আমাদের আত্মপরিচয়ের অনুভূতি বাস্তব মনে হলেও এটি মস্তিষ্কের তৈরি একটি নির্মাণ। সব প্রমাণ একত্রে দেখায়, আমাদের “আমি” বা আত্মপরিচয়ের অনুভূতি কোনো স্থির জিনিস নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের তৈরি একটি চলমান নির্মাণ, যা মস্তিষ্ক নিরলসভাবে তৈরি ও বজায় রাখে।


Leave a Reply