মানুষের উৎপত্তি হয়েছিল, বিজ্ঞানীদের ধারণা, আদিতম প্রাইমেট ছিল গেছো চিকার মতো দেখতে ছোট ও নিশাচর প্রাণী। এ ধরনের প্রাণীর উৎপত্তির মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রাইমেটের বিকাশ। বিকশিত ধারাগুলোকে বিজ্ঞানীরা দুটি উপবর্গের বিভক্ত ১. স্ট্রেপসিরহিনি এবং ২. হ্যাপ্লোরহিনি, এ দুই উপবর্গের সদস্যদের যথাক্রমে নতুন পৃথিবীর বানর এবং পুরনো পৃথিবীর বানর বলে। ছাটি গোত্র নিয়ে হ্যাপ্লোরহিনি উপবর্গ গঠিত। মানুষ যে গোত্রের অন্তর্ভুক্ত তার নাম হ্যাপ্লোরহিনি। গরিলা, শিম্পাঞ্জি, ওরাং ওটান ও মানুষ হচ্ছে হোমিনিড।
মানুষের সুগঠিত মস্তিষ্ক এবং প্রাণীকুলে সর্ববৃহৎ (১৩০০-১৪৫০ ঘন সেন্টিমিটার), সেরেব্রাল হেমিস্ফিয়ার সুবিকশিত।
এবার, বুদ্ধি বা চিন্তা করার জন্য যে মস্তিষ্ক থাকতেই হবে, এমন কোন কথা নেই! হাইড্রা, জেলিফিশ, সি অ্যানিমোন, স্টারফিশ এদের কোনটারই মস্তিষ্ক নেই। এগুলো নিডারিয়া পর্বভুক্ত প্রাণী। কিন্তু এরা শিকার ধরে, আশেপাশের পরিবেশ বুঝতে পারে, বিপদ এড়িয়ে চলে। তাহলে কি দাঁড়াবে? মস্তিষ্কহীন প্রাণীরাও কি ভাবতে পারে?
বিজ্ঞানীদের মতে, মস্তিষ্ক না থাকলেও নিউরন থাকতে পারে। সামুদ্রিক স্পঞ্জ আর প্ল্যাকোজোয়ান বাদে প্রায় সব প্রাণীরই নিউরন আছে, অর্থাৎ পরিফেরা পর্বের প্রাণীরা ছাড়া অন্য সকল প্রাণীদের নিউরন থাকতে পারে। জেলিফিশ বা সি অ্যানিমোনের দেহজুড়ে ছড়িয়ে থাকে স্নায়ুর জাল। এই স্নায়ু জালই তাদের সংবেদন শনাক্ত করে এবং সেটার ভিত্তিতে সারা দেহে সাড়া দেয়। সাঁতার কাটা, সংকোচন, শিকার করা ইত্যাদি। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক ছাড়াই তারা তথ্য প্রক্রিয়া করতে পারে।
এই সরল স্নায়ুতন্ত্র দিয়েও তারা আশ্চর্যজনক জটিল কাজ করে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, স্টারলেট সি অ্যানিমোন নামের একটি প্রাণী মেমরি গঠন করতে পারে। এর মানে হলো, সে দুটি আলাদা ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে শেখে। যেমন, একটি নির্দোষ আলোর ঝলকানির সাথে মৃদু বৈদ্যুতিক শক জুড়ে দিলে, পরে শক ছাড়াই শুধু আলো দেখলেই সে সঙ্কুচিত হয়ে যায়।
আরেক পরীক্ষায় দেখা গেছে, সি অ্যানিমোনরা বারবার দেখা করার পর তাদের জিনগতভাবে অভিন্ন প্রতিবেশীকে চিনতে পারে এবং তাদের প্রতি স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক আচরণ কমিয়ে দেয়। এটা প্রমাণ করে যে তারা নিজ এবং পর এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বক্স জেলিফিশ দৃষ্টি সংকেত এবং বস্তু সংস্পর্শে শারীরিক অনুভূতির মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে পারে, যা তাদের বাধা এড়িয়ে চলতে সাহায্য করে।
যেসব প্রাণীর মস্তিষ্ক না থাকলেও স্নায়ু আছে, তারা যেভাবে চিন্তা করে
ভাবনা বা চিন্তা করার সংজ্ঞা নির্ভর করে আপনি কোন ক্ষেত্র থেকে দেখছেন তার উপর। মনোবিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী এবং স্নায়ুবিজ্ঞানী প্রত্যেকেই চিন্তা -কে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। বিজ্ঞানীরা সাধারণত চিন্তা শব্দটি ব্যবহার করতে চান না, বরং কগনিশন বা জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া শব্দটি পছন্দ করেন। চিন্তা বলতে আমরা সাধারণত বুঝি মাথার ভেতরে কিছু চলাফেরা করা, কিন্তু অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে সেটা আছে কিনা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না।
কগনিশন -এরও কোন একক সংজ্ঞা নেই। তবে সবচেয়ে মোটা দাগে বলতে গেলে, কগনিশন হলো বাইরের দুনিয়া এবং দেহের ভেতরের তথ্য নিয়ে প্রক্রিয়া করে কোন কাজ করা। যদি চিন্তা করাকে এই অর্থে নেওয়া হয়, তাহলে বলা যায়, সব জীবই কোনো না কোনোভাবে চিন্তা করে। এমনকি যাদের নিউরনও নেই, যেমন পরিফেরা পর্বের সামুদ্রিক স্পঞ্জরাও পরিবেশ সম্পর্কিত তথ্য প্রক্রিয়া করে বেঁচে থাকে।
তবে মৌলিক শেখার বাইরে আরও উন্নত জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া (এডভান্সড কগনিশন) নিয়ে এখনও সন্দেহ আছে। রিফ্লেক্স বা অনৈচ্ছিক প্রতিক্রিয়ার বাইরে যেকোনো আচরণ পরিবর্তনকে মৌলিক জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া ধরা যায়। সেই অর্থে, মস্তিষ্কহীন প্রাণীরাও জ্ঞানীয় ক্ষমতার প্রদর্শন করে। তবে আরও উন্নত জ্ঞানীয় ক্ষমতার জন্য হয়তো চেতনা বা আত্ম-সচেতনতার প্রয়োজন হতে পারে।
নিডারিয়া পর্বভুক্ত জেলিফিশ, সি অ্যানিমোনদের যে গোষ্ঠী, তারা সাতশো মিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। মস্তিষ্কসম্পন্ন বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু তারা আজও সফলভাবে বেঁচে আছে।
এই সহনশীলতা প্রমাণ করে যে, মস্তিষ্ক না থাকলেও তাদের মধ্যে একটা অনন্য অভিযোজন ব্যবস্থা আছে, যা ভূতাত্ত্বিক সময়ের পরিক্রমায় চরম পরিবেশেও টিকে থাকতে এবং উন্নতি করতে সাহায্য করেছে। তাদের নিউরনগুলো পরিবেশকে অনুভব এবং ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। এটাই হয়তো চিন্তা -র এক প্রাথমিক রূপ।


Leave a Reply