একটি পাত্রে পানি গরম করলে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে পানি স্ফুটিত হয় এবং তলদেশ থেকে বুদবুদ উঠে জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়, কিন্তু পাত্রটিকে যদি স্ফুটনাঙ্কের অনেক বেশি তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়, তখন এক আশ্চর্য আচরণ দেখা যায়। এক ফোঁটা পানি উত্তপ্ত কড়াইয়ে ছেড়ে দিলে পানির অণুগুলো বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে যায়।
![]() |
| কড়াইয়ে পানির ফোঁটা |
পানির ফোঁটা বাষ্পে পরিণত না হয়ে পাত্রের ওপর পিংপং বলের মতো নাচতে থাকে। এর কারণ হলো, অতিরিক্ত উত্তপ্ত পৃষ্ঠে পানির ফোঁটার নিচের অংশ মুহূর্তেই বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে একটি অদৃশ্য বাষ্পস্তর তৈরি করে, যা ফোঁটাটিকে গরম পাত্রের সরাসরি সংস্পর্শ থেকে আলাদা রাখে।
এই বাষ্পস্তর তাপ পরিবহণে দুর্বল হওয়ায় পানির ফোঁটা খুব ধীরে ধীরে তাপ গ্রহণ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে বাষ্পীভূত হয় না; বরং ঘর্ষণ প্রায় শূন্য হয়ে যাওয়ায় পাত্রের ভেতর এদিক-সেদিক ছুটে বেড়ায়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় লিডেনফ্রস্ট প্রভাব, যার ব্যাখ্যা প্রথম দেন জার্মান বিজ্ঞানী জোহান গটলব লেইডেনফ্রস্ট ১৭৫৬ সালে, আর যে তাপমাত্রায় এই প্রভাব শুরু হয় তাকে বলা হয় লিডেনফ্রস্ট বিন্দু।
এই বিন্দু নির্ভর করে তরলের প্রকৃতি, ফোঁটার আয়তন এবং পাত্রের পৃষ্ঠের ওপর; সাধারণভাবে যেসব তরলের পৃষ্ঠটান বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে লিডেনফ্রস্ট প্রভাব ঘটতে তুলনামূলক বেশি তাপমাত্রা লাগে। উদাহরণস্বরূপ, বিশুদ্ধ পানি ও তামার পাত্রে এই প্রভাব দেখা যায় প্রায় ২৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, কিন্তু গ্লিসারল বা সাধারণ অ্যালকোহলের ক্ষেত্রে অনেক কম তাপমাত্রায় এটি সম্ভব। এমনকি তরল নাইট্রোজেনের (N2) মতো ক্রায়োজোনিক পদার্থে সাধারণ কক্ষ তাপমাত্রাতেই লিডেনফ্রস্ট প্রভাব দেখা যায়, কারণ তাদের স্ফুটনাঙ্ক অত্যন্ত কম।
এই ধারণা কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা বিশেষ থার্মোস্ট্যাট ও তাপ-নিরোধক ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যেখানে পানির ফোঁটার চলাচল ব্যবহার করে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, পাশাপাশি উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করা ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশকে অতিরিক্ত তাপ থেকে রক্ষা করতেও লিডেনফ্রস্ট প্রভাব ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


Leave a Reply