একসময় মনে করা হতো টাইপ ২ ডায়াবেটিস মানেই আজীবন এই রোগ নিয়ে বেঁচে থাকা। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সঠিক জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে টাইপ ২ ডায়াবেটিসকে রিমিশন বা নিয়ন্ত্রণের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এর মূল রহস্য হলো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর উপর চাপ কমানো, বিশেষ করে লিভার ও অগ্ন্যাশয়ে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি কমানো। ধারাবাহিকভাবে ওজন কমালে শরীর আবার স্বাভাবিকভাবে রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ফিরে পেতে পারে।

মানবদেহের প্রধান শক্তির উৎস হলো রক্তে থাকা গ্লুকোজ। আমরা যখন কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাই, তখন তা ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয় এবং রক্তে প্রবেশ করে। তখন অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামের হরমোন নিঃসৃত হয়, যা গ্লুকোজকে কোষে পৌঁছে দেয় যাতে শরীর তা শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অতিরিক্ত গ্লুকোজ লিভার ও পেশীতে জমা থাকে। পরে যখন শরীরে গ্লুকোজ কমে যায়, তখন গ্লুকাগন নামের আরেকটি হরমোন লিভারকে সেই সঞ্চিত গ্লুকোজ আবার রক্তে ছাড়তে বলে। এই পুরো প্রক্রিয়া মিলেই শরীরের গ্লুকোজের ভারসাম্য বজায় রাখে।
ডায়াবেটিসের প্রধানত দুই ধরনের রূপ আছে: টাইপ ১ এবং টাইপ ২। টাইপ ১ ডায়াবেটিসে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে শরীর ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না এবং রোগীকে প্রতিদিন ইনসুলিন নিতে হয়। বর্তমানে টাইপ ১ ডায়াবেটিস সম্পূর্ণভাবে নিরাময়যোগ্য নয়।
আরো পড়ুন: লোনাপানির জন্য জনজীবন বিপর্যস্ত
অন্যদিকে টাইপ ২ ডায়াবেটিস বেশি দেখা যায় এবং সাধারণত তখন ঘটে যখন শরীর ইনসুলিন ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না অথবা পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি হয় না। এর বড় একটি কারণ হলো লিভার ও অগ্ন্যাশয়ের চারপাশে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি। এই চর্বি ইনসুলিনের স্বাভাবিক কাজকে বাধা দেয়, ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে অগ্ন্যাশয় অতিরিক্ত কাজ করতে করতে দুর্বল হয়ে যায় এবং তখন ডায়াবেটিস স্পষ্টভাবে দেখা দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ১৫ কেজি ওজন কমাতে পারলে লিভার ও অগ্ন্যাশয়ের চর্বি দ্রুত কমে যায়। এতে ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা বাড়ে এবং অগ্ন্যাশয় আবার স্বাভাবিকভাবে ইনসুলিন তৈরি করতে শুরু করতে পারে। এর ফলে অনেক রোগীর রক্তে গ্লুকোজ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে।
২০১৪ সালে শুরু হওয়া বিখ্যাত DiRECT (Diabetes Remission Clinical Trial) গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের একটি কম-ক্যালোরিযুক্ত খাদ্য পরিকল্পনা অনুসরণ করানো হয়েছিল, যেখানে দিনে প্রায় ৮০০ ক্যালোরি গ্রহণ করা হতো স্যুপ ও শেকের মাধ্যমে। ফলাফল ছিল উল্লেখযোগ্য। এক বছর পর অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৪৬ শতাংশের ডায়াবেটিস রিমিশনে যায়, আর দুই বছর পরও ৩৬ শতাংশের ক্ষেত্রে এই অবস্থা বজায় থাকে, তাও ডায়াবেটিসের ওষুধ ছাড়াই। পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, কেউ যদি ওজন ধরে রাখতে পারে তবে এই সুবিধা কয়েক বছর পর্যন্ত থাকতে পারে।
টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কমানো। যেমন সাদা রুটি, চিনিযুক্ত পানীয়, পেস্ট্রি, সাদা ভাত বা উচ্চ গ্লাইসেমিক সূচকের খাবার দ্রুত গ্লুকোজে পরিণত হয় এবং রক্তে শর্করা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয়। তাই অনেক বিশেষজ্ঞ অতিরিক্ত চিনি বাদ দেওয়া এবং কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে প্রোটিন ও উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার যেমন ওটস, ডাল, মসুর, শাকসবজি ইত্যাদি বেশি খাওয়ার পরামর্শ দেন।
নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন আমরা হাঁটি বা ব্যায়াম করি, তখন পেশীগুলো রক্ত থেকে গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তি তৈরি করে। এতে রক্তে শর্করা কমে যায় এবং সময়ের সাথে সাথে শরীর ইনসুলিনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুরুতে ভারী ব্যায়াম না করলেও চলবে, খাবারের পরে ১০–১৫ মিনিট হাঁটাও অনেক উপকার করতে পারে।
এছাড়া ঘুম ও মানসিক চাপও ডায়াবেটিসের উপর প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে কর্টিসলসহ স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়, যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপও একইভাবে ইনসুলিন প্রতিরোধ বাড়িয়ে দেয়।
সব মিলিয়ে গবেষণা বলছে, টাইপ ২ ডায়াবেটিস এখন আর শুধু ওষুধের ওপর নির্ভরশীল একটি স্থায়ী রোগ নয়। ওজন কমানো, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত চলাফেরা, ভালো ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এই সব পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা বা রিমিশনে নেওয়া সম্ভব। তবে এটি স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে হলে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: sciencefocus.com
