‘প্রকৃতি’ শব্দটি আমরা এতবার শুনেছি, যে তার মাহাত্ম্য আমরা অনুভব করতেই ভুলে গেছি।
চারপাশে সে বিরাজমান, তবু আমরা কি সত্যিই তাকে দেখি? রাস্তাঘাটের কোলাহল, পড়াশোনার চাপ, অর্থনীতি আর রাজনীতির দৌরাত্ম্যে আমাদের মন এতটাই ভারাক্রান্ত যে, প্রকৃতি যেন আমাদের জীবনে এক নীরব দর্শকে পরিণত হয়েছে। তার দিকে চোখ ফেরানোর সময়ই বা কোথায়?
কিন্তু প্রকৃতিকে আমরা যতটা সরলভাবে দেখি, সে কি আদৌ ততটাই সরল?
আমরা সবাই জানি, গাছের জীবন আছে। তবুও আমাদের কাছে গাছ যেন কেবল একটি নির্বাক বস্তু। ছায়া দিলেও কৃতজ্ঞতার দাবি করে না, ফল দিলেও কোনো মূল্য চায় না, কেটে ফেললেও প্রতিবাদ করে না। গাছ যতদিন বাঁচে, ততদিন শুধু দিয়ে যায় নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে।
এই ‘নির্বাক’ সত্তাই আমাদের শেখাতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। তার তথাকথিত বোকাসোকা আচরণ কি আসলে বোকামি, নাকি আমাদের জন্য এক পরম বুদ্ধিমত্তার নিঃশব্দ বার্তা? আমরা, যারা নিজেদের জ্ঞানী বলে দাবি করি, প্রকৃতির এই নিরব বার্তাটি কি সত্যিই বুঝতে পেরেছি?
সৃষ্টিকর্তা অত্যন্ত নিপুণভাবে এই প্রকৃতি এবং তার প্রতিটি উপাদান আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। যেন আমরা কেবল উপভোগই না করি, বরং এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। প্রতিটি গাছ, পাখি, মেঘ কিংবা নদী সবকিছু যেন এক একটি জীবন্ত পাঠ্যবই। তাই এই নিখুঁত সৃষ্টির সৌন্দর্য কেবল দেখার জন্য নয়; তা আমাদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে, আর এখান থেকে পাওয়া জ্ঞান ও অনুপ্রেরণাকে ছড়িয়ে দিতে হবে আমাদের চিন্তায়, কাজে ও উদ্ভাবনে।
আপনি কখনও আপনার হাতের দিকে গভীরভাবে তাকিয়েছেন?
কোথাও কি কোনো তীক্ষ্ণ, ধারালো কিছু চোখে পড়েছে?
না, নখের কথা বলছি না। অন্য কিছু?
সম্ভবত না। তাহলে প্রশ্ন জাগে, প্রকৃতি কেন আমাদের হাতে কোনো ধারালো কিছু রাখেনি? সে কি ভুল করেছিল?
নাকি এই নিরীহ নকশার মধ্যেই লুকিয়ে আছে কোনো গভীর সত্য?
আসুন এবার বাইরের প্রকৃতির দিকে চোখ ফেরানো যাক। সিংহের দাঁত, ঈগলের ঠোঁট, বা কাঁটায় ঢাকা ঝোপ এসব নিশ্চয়ই ধারালো। কিন্তু প্রকৃতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মসৃণ ও বাঁকানো। নদীর প্রবাহ বক্র, গাছের শাখা ছড়ানো, পাহাড়ের প্রান্তগুলোও গোলাকার। কেন এমন?
হয়তো প্রকৃতি জানত, ধারালো জিনিস ক্ষণস্থায়ী, সময়ের সাথে সাথে ভেঙে যায়, ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তাই সে নিজের নকশায় রেখেছে স্থায়িত্ব, রেখেছে ধৈর্য।
তাহলে আমরা যখন আধুনিক ভবন নির্মাণ করি, কেন সেখানে এত সোজাসাপ্টা, ধারালো কোণ দেখি?
প্রাচীন স্থাপনাগুলোর দিকে তাকান। সেখানে অনেক বাঁকানো, গোলাকার আকৃতির গঠন চোখে পড়ে। তারা কি এমন কোনো সত্য উপলব্ধি করেছিল, যা আমরা আজ ভুলে গেছি?
আবার ফিরে আসুন আপনার হাতের কাছে। আঙুলগুলো যতদূর সম্ভব প্রসারিত করুন। দেখুন আঙুলের মাঝের ফাঁকা জায়গাগুলো। মনে হয়, যেন একটি গাছের গুঁড়ি মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। আপনার আঙুল, আপনার হাত, এগুলো কি প্রকৃতির কোনো গোপন ছাঁচে তৈরি?
আপনি কি কখনও দেখেছেন, একটি চার-পাঁচতলা ভবন কেবল একটি খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে আছে?
সম্ভবত না। কারণ, স্থপতিরা জানেন ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে ভিত্তি হতে হবে শক্তিশালী ও প্রশস্ত। কিন্তু প্রকৃতির দিকে তাকান। একটি গাছের গুঁড়ি, যা আপনি চাইলে আলতো করে জড়িয়েও ধরতে পারেন, কীভাবে সে এত বিশাল শাখা-প্রশাখা ও পাতার ভার বহন করে?
তা কি শুধুই তার শিকড়ের কারণে?
তালগাছ আর স্টিলের রডের প্রস্থচ্ছেদের দিকে তাকান। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ স্তরের গঠনে অদ্ভুত মিল রয়েছে। আপনি যদি মাইক্রোস্কোপের নিচে একটি গাছের গুঁড়ি আর একটি লোহার রড রাখেন, সহজে বোঝা কঠিন কোনটা কোনটি। কারণ, তাদের গঠনের মূলনীতি প্রায় এক।
এবার ভাবুন মানুষের মাথার খুলি সম্পর্কে। আপনি নিশ্চয় বইয়ে মাথার খুলির ছবি দেখেছেন। হয়তো নামও জানেন বিভিন্ন হাড়ের।
প্রশ্ন হলো, সৃষ্টিকর্তা কেন এই খুলিকে একটি একক খণ্ডে তৈরি করেননি?
বরং সেটিকে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করেছেন। আপনি যদি কখনও টাইলস বসানো দেখেন, তাহলে লক্ষ্য করবেন, প্রতিটি টাইলসের মাঝে একটি ফাঁকা জায়গা থাকে। খুলির হাড়গুলোর মাঝেও থাকে ফাঁকা স্থান। দুটোর উদ্দেশ্যও প্রায় এক সহনশীলতা, স্থিতিশীলতা।
অনেকেই হয়তো ভাবছেন, ‘এই মানুষটা একের পর এক আমাদের অপমান করে চলেছে।’ না, আমার উদ্দেশ্য অপমান নয়। বরং আপনাদের চোখ খুলে দেখানোর চেষ্টা করছি যে, এই নীরব প্রকৃতির প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি শাখা, প্রতিটি আকার, সবকিছুতেই লুকিয়ে আছে অব্যক্ত জ্ঞান। হয়তো এমন প্রশ্নের উত্তরও প্রকৃতির কাছে রয়েছে, যে প্রশ্ন আমরা এখনো করতে শিখিনি। এই জ্ঞান আমাদের সাহায্য করতে পারে জীবন গড়তে, সভ্যতা নির্মাণে, উদ্ভাবনের পথে এগোতে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, কীভাবে শিখব আমরা এই প্রকৃতির পাঠ?
কারণ কেউ আমাদের বলেনি, কীভাবে প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নিতে হয়। ঠিক সেই কারণেই, আমরা শুরু করতে যাচ্ছি এক নতুন যাত্রা, একটি ধারাবাহিক সিরিজ, যেখানে আমরা ধাপে ধাপে প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা করব। আমরা খুঁজে বের করব, কেন প্রকৃতি এমন, প্রতিটি সৃষ্টির অন্তর্নিহিত কারণ কী, আর কীভাবে এই নিখুঁত নকশার মাঝেই লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য সেরা অনুপ্রেরণা।


Leave a Reply