আলো জানে কীভাবে কোন পথ সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত?
আসলে আলো “জানে” না। জানার মতো কোনো ইচ্ছাশক্তি বা সচেতনতা আলো বা অন্য কোনো মৌলিক কণার নেই। তবে তারা এমনভাবে আচরণ করে যেন বুঝে বুঝে চলছে! একে বলে কোয়ান্টাম লেভেলের সম্ভাব্যতা বা probability behavior। এখানে পদার্থবিজ্ঞানে আসে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এক অসাধারণ ধারণা: Feynman’s Path Integral Formulation।
✦ ফাইনম্যানের পথ-সমাকলন তত্ত্ব
রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন, যদি আলো A থেকে B পয়েন্টে যেতে চায়, তাহলে তা একবারে একটি নির্দিষ্ট পথ বেছে নেয় না। বরং সম্ভাব্য সব পথ ধরে একসঙ্গে চেষ্টা করে। আপনি যতগুলো পথ কল্পনা করতে পারেন, সবগুলো পথ দিয়ে আলো সম্ভাব্যভাবে “যাওয়ার চেষ্টা” করে। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়ম অনুসারে এইসব পথগুলোর মধ্যে যেগুলোর সময় লাগার পার্থক্য একে অপরের থেকে খুব বেশি, তাদের প্রভাব একে অপরকে বাতিল করে দেয়।
অন্যদিকে, যেসব পথগুলো সংক্ষিপ্ততম সময় নেয় এবং যাদের সময় পার হওয়ার পার্থক্য খুব সামান্য, তারা একে অপরকে বাড়িয়ে দেয় বা constructive interference তৈরি করে। ফলে এই পথটাই বাস্তবিক আলোকে নির্দেশ করে, তাতেই সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই পথটাই আমরা দেখি। অর্থাৎ, আলো অনেক পথের মধ্য দিয়ে যাবার চেষ্টা করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে পথটা সময়ে সবচেয়ে ছোট, সেটাই বাস্তবে বাস্তবায়িত হয়। এটিই হলো ফার্মার নীতি এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সংমিশ্রণ।
বাস্তব জীবনে এর প্রমাণ বা উদাহরণ কী?
➤ আপনি যখন পানিতে এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে পানির নিচে পড়ে থাকা একটি কয়েনের দিকে তাকান, তখন তা মনে হয় একটু সরে গেছে। কারণ আলো পানিতে এসে অন্য মাধ্যমে ঢোকার সময় বাঁকা হয়ে গেছে।
➤ আবার গরম রাস্তায় দূর থেকে তাকালে মনে হয় পানি জমে আছে, একধরনের মরীচিকা। এটিও আলোর পথে বেঁকে যাওয়ার প্রভাব।
➤ সূর্যের আলো যখন কোনো নক্ষত্রের পাশ দিয়ে আসে, তখন সেই নক্ষত্রের মহাকর্ষ বলের কারণে স্পেসটাই বেঁকে যায় এবং আলোও তার পথ বেঁকিয়ে নেয়। এই ঘটনাকেই বলা হয় gravitational lensing। এতে দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রকে আমরা দ্বিগুণ বা বিকৃত আকারে দেখতে পাই।
আলো চলার এই নীতির গুরুত্ব কোথায়?
এই নীতিই শুধু আলো নয়, সব ধরনের তরঙ্গ বা কণার আচরণ বুঝতে সাহায্য করে, বিশেষ করে কোয়ান্টাম স্তরে। এ নীতির ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে আধুনিক লেজার প্রযুক্তি, অপটিক্যাল ফাইবার, ক্যামেরা লেন্স, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা এমনকি চিকিৎসাবিদ্যার অনেক যন্ত্রপাতি।
আলো কীভাবে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ বেছে নেয়, এই প্রশ্ন আপাতদৃষ্টিতে সহজ হলেও, এর পেছনে রয়েছে জটিল কোয়ান্টাম বাস্তবতা। ফার্মার নীতি আমাদের বলে দেয়, প্রকৃতি নিজেই এমনভাবে সাজানো যে, সময় ও শক্তি ন্যূনতম খরচ হয় এমন পথই বাস্তবে ঘটে। মানুষের মতোই আলোও “সোজা পথে নয়, সংক্ষিপ্ত পথে” চলার চেষ্টা করে, যদিও তা ইচ্ছাকৃত নয়, বরং প্রকৃতির গভীর নিয়ম মেনে।
আলো সব সময় ‘সরল’ পথে চলে। আরেকটু সঠিকভাবে বলা যায়, আলো সব সময় সংক্ষিপ্ততম পথে চলে। পথ যদি হয় বাঁকা, তখন আলো বাধ্য হয়ে বাঁকা পথ ধরে৷ যেমন সূর্য বা বিশাল ভারী নক্ষত্র তার আশপাশের স্থান-কাল বাঁকিয়ে দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে আলো বাঁকা পথ ধরে। এ ব্যাপারটা বুঝতে আসলে রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়া লাগে না। কিন্তু যত যা-ই হোক, মজার ব্যাপার হলো, আলো চলার জন্য সবচেয়ে ছোট পথটাই বেছে নেয়। যেটাকে আগেই বলেছি, সংক্ষিপ্ততম পথ। আরেকটু ব্যাখ্যা করি। এক জায়গা থেকে আলো যখন আরেক জায়গায় যায়, তখন হয়তো সেখানে অনেক বিকল্প পথ থাকে। কিন্তু পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, আলো সবচেয়ে ছোট ও দ্রুততম, অর্থাৎ ছোট পথটিই বেছে নেয়।
প্রশ্ন হলো, আলো কীভাবে বোঝে কোন পথটা সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত? স্কুলে বা পাঠ্যবইতে আলো নিয়ে পড়ার সময় এই প্রশ্নটা হয়তো সবাইকেই ভাবায়। প্রশ্নটা ভাবিয়েছিল কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আরউইন শ্রোডিঙ্গারকেও। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রথম স্পষ্টভাবে প্রশ্ন তোলেন বিশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদার্থবিদ, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান। তিনি বলেছিলেন, ‘এত ছোট কণা কীভাবে জানে কোন রাস্তাটা সংক্ষিপ্ত?
সূত্রঃ SciTechdaily.com


Leave a Reply