মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত শক্তির ইতিহাস। আগুনের আবিষ্কার থেকে শুরু করে কয়লানির্ভর শিল্প বিপ্লব, তেল-গ্যাসভিত্তিক আধুনিক সভ্যতা, এবং পরমাণু ফিশন। প্রতিটি নতুন শক্তির উৎস আমাদের প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু ২১শ শতাব্দীতে এসে আমরা এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পাবনা।
টোকামাক প্রযুক্তি ও ফিউশন শক্তির ভবিষ্যৎ
মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত শক্তির ইতিহাস। আগুনের আবিষ্কার থেকে শুরু করে কয়লানির্ভর শিল্প বিপ্লব, তেল-গ্যাসভিত্তিক আধুনিক সভ্যতা, এবং পরমাণু ফিশন প্রতিটি নতুন শক্তির উৎস আমাদের প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু ২১শ শতাব্দীতে এসে আমরা এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি, জীবাশ্ম জ্বালানি দ্রুত নিঃশেষ হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব (সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া) বাড়ছে, এবং শক্তির চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন সময় এসেছে এমন একটি শক্তির উৎসের, যা পরিষ্কার, নিরাপদ, অসীম এবং দীর্ঘমেয়াদি।
এই প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞানীরা ফিরে তাকিয়েছেন সূর্যের দিকে। সূর্য যে প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অপরিমেয় শক্তি উৎপন্ন করে চলেছে। পারমাণবিক ফিউশন তাকেই তাঁরা দেখছেন ভবিষ্যতের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে।
ফিউশন কী এবং কেন এটি বিপ্লব ঘটাবে?
ফিউশনে হাইড্রোজেনের দুটি সমস্থানিক (আইসোটোপ) ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম অত্যধিক উচ্চ তাপমাত্রায় একীভূত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত করে। এই পদ্ধতিতে হাইড্রোজেন বোমা এবং সূর্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন বোমা তৈরি করা হয়। অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে অনেক শক্তি পাওয়া যায়। যা কিনা পারমাণবিক ফিশন এর মাধ্যমে তৈরিকৃত ভারী ইউনিয়ন থেকে ইউরেনিয়াম প্রাপ্ত শক্তি থেকেও অনেক শক্তি।

আরো পড়ুন
এই প্রক্রিয়ায় কোনো কার্বন নিঃসরণ নেই
তেজস্ক্রিয় বর্জ্য খুবই কম এবং স্বল্পস্থায়ী
জ্বালানি ডিউটেরিয়াম পৃথিবীর সমুদ্রজলে প্রায় অসীম পরিমাণে রয়েছে
অবিশ্বাস্যভাবে, মাত্র এক লিটার সমুদ্রের পানি থেকে পাওয়া ডিউটেরিয়াম দিয়ে উৎপন্ন শক্তি একজন মানুষের সারাজীবনের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে পারে!
কিন্তু সমস্যা হলো সূর্যের কেন্দ্রে ফিউশন ঘটে প্রায় ১.৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে। পৃথিবীতে তা ঘটাতে হলে প্রয়োজন আরও বেশি: প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি! এই তাপমাত্রায় পদার্থ প্লাজমা নামক চতুর্থ অবস্থায় পরিণত হয় এমন কোনো ধাতব পাত্র নেই যা এই উত্তাপ সহ্য করতে পারে।
টোকামাক, চৌম্বকীয় খাঁচায় প্লাজমাকে আটকে রাখা
এই চ্যালেঞ্জের সমাধান হিসেবে এসেছে টোকামাক একটি ডোনাট (টরাস) আকৃতির চেম্বার, যেখানে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে প্লাজমাকে দেয়াল স্পর্শ না করেই শূন্যে ভাসিয়ে রাখা হয়।

এই প্রযুক্তির ধারণা প্রথম এসেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৫০-এর দশকে, রুশ বিজ্ঞানী আন্দ্রে শাখারভ ও ইগর তাম এর কাজের মাধ্যমে এটি পরিপূর্ণ রূপ পায়।
টোকামাকে দুটি প্রধান চৌম্বক ক্ষেত্র,টরয়ডাল ও পোলয়ডাল মিলে প্লাজমাকে স্ক্রুর মতো প্যাঁচানো পথে ঘুরতে বাধ্য করে। প্লাজমাকে উত্তপ্ত করা হয় ওহমিক হিটিং, রেডিও তরঙ্গ এবং নিউট্রাল বিম ইনজেকশনের মাধ্যমে।
২০২৫-২০২৬: ফিউশন গবেষণার রেকর্ডের বছর
সাম্প্রতিক বছরগুলো ফিউশনের জন্য অসাধারণ।
চীনের EAST টোকামাক ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১,০৬৬ সেকেন্ড (প্রায় ১৮ মিনিট) ধরে উচ্চ তাপমাত্রার প্লাজমা বজায় রাখে।
ফ্রান্সের WEST টোকামাক ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ এই রেকর্ড ভেঙে দেয় ১,৩৩৭ সেকেন্ড (২২ মিনিটেরও বেশি)! প্লাজমার তাপমাত্রা ছিল ৫০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস, এবং টাংস্টেন-ভিত্তিক দেয়াল এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
জাপান-ইউরোপের যৌথ প্রকল্প JT-60SA বিশ্বের সবচেয়ে বড় টোকামাক হিসেবে ১৬০ কিউবিক মিটার প্লাজমা ভলিউমের গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েছে (২০২৫ সালে), যা ITER-এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি। ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এতে উন্নত পরীক্ষা শুরু হবে।
রাশিয়ার T-15MD টোকামাকও অগ্রসর হচ্ছে, উচ্চ তাপমাত্রা অতিপরিবাহী চুম্বক ও লিথিয়াম-প্রলেপিত দেয়াল নিয়ে গবেষণা চলছে।
বেসরকারি খাতে Tokamak Energy (যুক্তরাজ্য) ২০২৫ সালে ST40 ডিভাইসে নতুন রেকর্ড গড়েছে। 

১ মেগা-অ্যাম্পিয়ার প্লাজমা কারেন্ট, রেকর্ড ট্রিপল প্রোডাক্ট এবং HTS ম্যাগনেটে ১১.৮ টেসলা ফিল্ড। ২০২৬-এ আরও উন্নত ফলাফল আশা করা হচ্ছে।
MEPhI-এর MEPhIST: শিক্ষা ও দূরবর্তী সহযোগিতার নতুন দ্বার
রাশিয়ার ন্যাশনাল রিসার্চ নিউক্লিয়ার ইউনিভার্সিটি MEPhI বিশ্বের প্রথম অনলাইন নিয়ন্ত্রিত শিক্ষামূলক টোকামাক MEPhIST (বা MEPHIST-0) তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের শেষে এটিকে Rosatom এর ইউনিফাইড ইনফরমেশন স্পেসের সঙ্গে যুক্ত করে রিমোট পার্টিসিপেশন সেন্টার খোলা হয়েছে। এর ফলে বিশ্বের যেকোনো দেশের বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীরা দূর থেকে পরীক্ষা চালাতে পারবেন।
MEPhI-এর বিজ্ঞানী ইউরি মিকায়েলোভিচ গ্যাসপারিয়ান বলেছেন, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য ফিউশন শক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা বাংলাদেশের সঙ্গে শিক্ষা, গবেষণা ও দূরবর্তী সহযোগিতায় প্রস্তুত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফিউশন: একটি কৌশলগত সম্ভাবনা
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত দ্রুত কমছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এর মাধ্যমে আমরা ফিশন প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করছি। এই অভিজ্ঞতা ফিউশন গবেষণায় প্রবেশের শক্ত ভিত্তি হতে পারে।
ফিউশন গবেষণায় দক্ষতা অর্জন করলে নতুন খাত তৈরি হবে: প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞান, উন্নত উপাদানবিজ্ঞান, উচ্চক্ষমতা প্রকৌশল, নিউট্রন প্রযুক্তি। এটি প্রযুক্তিনির্ভর, উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
উপসংহার: স্বপ্ন এখন বাস্তবের খুব কাছে
ফিউশনের পথে এখনও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীল প্লাজমা, চুল্লির দেয়ালের সহনশীলতা, অতিপরিবাহী চুম্বকের ব্যাপক উন্নয়ন। কিন্তু ২০২৫-২০২৬ সালের রেকর্ডগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, অগ্রগতি দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। ITER এর প্রথম প্লাজমা এখন ২০৩৩-৩৪ সালের দিকে প্রত্যাশিত, এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলো ২০৩০-এর দশকে বাণিজ্যিক ফিউশনের দিকে এগোচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো শক্তিসংকটাপন্ন ‌দেশের জন্য এখনই প্রস্তুতি নেওয়ার সময়। বিশ্ব যখন কৃত্রিম সূর্য তৈরির দিকে এগোচ্ছে, তখন পিছিয়ে থাকা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিরাট ক্ষতি হবে।
আসুন, আমরাও এই যাত্রায় যোগ দিই একটি পরিষ্কার, অসীম এবং সমৃদ্ধ পৃথিবীর জন্য।

ফিউশনের পথে এখনও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরাও এই যাত্রায় যোগ দিই একটি পরিষ্কার, অসীম এবং সমৃদ্ধ পৃথিবী জন্য।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *