বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা যেন ছিল সীমান্তহীন এক জ্ঞাননদী, যা বিভিন্ন ইনস্টিটিউট ও ব্যক্তিগত চিঠির মাধ্যমে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়ত, আর সেই প্রবাহের সাহসী নাবিকদের একজন ছিলেন লিজ মাইটনার।
![]() |
| উইকিপিডিয়া |
যিনি অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরে জন্ম নিয়ে এমন এক সময়ে তেজস্ক্রিয়তা ও পারমাণবিক গবেষণায় নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন, যখন নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার দরজা প্রায় বন্ধই ছিল; তবু তিনি থামেননি, বরং ১৯৩৮ সালে নিউক্লিয়ার ফিশন বা পারমাণবিক বিভাজনের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে বিজ্ঞানের ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করে দেন, যদিও ১৯৪৪ সালে এই আবিষ্কারের পরীক্ষামূলক অংশের জন্য তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী অটো হান নোবেল পুরস্কার পেলেও লিজকে উপেক্ষা করা হয়।
{inAds}
যা আজও বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের এক বেদনাময় বিতর্ক; ১৮৭৮ সালে জন্ম নেওয়া লিজ ১৯০৬ সালে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট অর্জনকারী দ্বিতীয় নারী হন, এরপর তিনি জার্মানির বার্লিন শহরে গিয়ে কিংবদন্তি পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাঙ্ক-এর বক্তৃতা শোনেন এবং সেখানেই অটো হানের সঙ্গে তাঁর বৈপ্লবিক গবেষণা সহযোগিতা শুরু হয়, যার ফলস্বরূপ ১৯১৭ সালে তাঁরা নতুন মৌল প্রোটেক্টিনিয়াম শনাক্ত করেন এবং লিজ ১৯২৬ সালে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী পদার্থবিজ্ঞান অধ্যাপক হন।
{inAds}
তাঁর গবেষণার কেন্দ্রে ছিল পরমাণুর গঠন ও ইউরেনিয়াম থেকে শক্তি মুক্তির রহস্য; কিন্তু ১৯৩৩ সালের পর জার্মানি-র রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নাৎসি নিপীড়নের কারণে ১৯৩৮ সালে তাঁকে পালিয়ে যেতে হয়, নেদারল্যান্ডস হয়ে তিনি আশ্রয় নেন সুইডেন-এ এবং কাইজার উইলহেম ইনস্টিটিউট-এ নিজের প্রতিষ্ঠিত অবস্থান পেছনে ফেলে আসেন, কিন্তু নির্বাসন তাঁর চিন্তার আগুন নিভাতে পারেনি, বরং সেই দূরত্ব থেকেই তিনি অটো হান ও ফ্রিটজ স্ট্রাসম্যান-এর পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করেন এবং তাঁর ভাইপো অটো রবার্ট ফ্রিশ-এর সঙ্গে মিলে আবিষ্কার করেন যে ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াস দুটি ছোট অংশে বিভক্ত হতে পারে।
{inAds}
তাঁরা এই প্রক্রিয়ার নাম দেন ফিশন এবং তাঁদের ব্যাখ্যা ১৯৩৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে Nature সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়ে বিজ্ঞানের ভিত কাঁপিয়ে দেয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তাঁকে ম্যানহাটান প্রজেক্ট-এ যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তিনি দৃঢ় কণ্ঠে তা প্রত্যাখ্যান করে মানবতার পাশে দাঁড়ান, যুদ্ধশেষে তিনি স্টকহোম ও ব্রিটেনে গবেষণা চালিয়ে যান এবং জীবদ্দশায় বহু সম্মাননা অর্জন করেন।
এমনকি পর্যায় সারণির ১০৯ নম্বর মৌল মাইটনারিয়াম তাঁর নামেই চিরস্থায়ী সম্মান হিসেবে জায়গা করে নেয়, আর ১৯৬৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সমাধিতে লেখা হয় এমন এক বাক্য, যা যেন তাঁর জীবনের সারাংশ, তিনি ছিলেন এমন একজন পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি বিজ্ঞানের শক্তিকে বুঝেছিলেন, কিন্তু কখনো তাঁর মানবতাকে হারাননি।


Leave a Reply