ইলেকট্রনের মতো অতিপারমাণবিক কণার কি সত্যিই লাটিমের মতো ঘোরা প্রয়োজন?
এই প্রশ্নের উত্তর হতো হ্যাঁ, যদি রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল নিখুঁত সত্য হতো। তাঁর মডেলে ইলেকট্রনগুলোকে নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে ঘোরার কথা। এই ঘূর্ণন বজায় রাখতে প্রয়োজন হতো এক অতিরিক্ত কৌণিক ভরবেগ, যা আসত ইলেকট্রনের নিজের অক্ষের ওপর ঘোরা থেকে। পৃথিবীর আহ্নিক গতি বা লাটিমের ঘূর্ণন দেখে বিষয়টি সহজ মনে হতে পারে।
![]() |
| ইলেকট্রনের আকারই একটি বিন্দুর মতো। |
ইলেকট্রন পৃথিবী বা লাটিম নয়। এদের ওপর রাজত্ব চলে না নিউটনের গাণিতিক বাস্তবতার। অতিপারমাণবিক জগতের পথঘাট বাঁধা পড়ে আছে কোয়ান্টাম তত্ত্বের অদ্ভুত নিয়মে, যেখানে স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞান যতই ঘোঁট পাকাক, পথ যে বেরোবে না তা নিশ্চিত।
ইলেকট্রন কি আসলে ঘোরে?
এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটি জন্ম নেয়। ইলেকট্রনকে আমরা প্রায়ই ছোট গোলকের মতো ভাবি, যেন ক্ষুদ্র বল। কিন্তু বাস্তবে ইলেকট্রন কোনো গোলক নয়। এটি হলো বিন্দু-সদৃশ কণিকা, যার কোনো ত্রিমাত্রিক বিস্তার নেই। ত্রিমাত্রা না থাকলে ঘূর্ণনের কথাই বা আসে কীভাবে? অর্থাৎ, ইলেকট্রন ঘোরে না। তাহলে স্পিন? স্পিন আছে, কিন্তু তা লাটিমের ঘূর্ণন নয়। এটি কণার অভ্যন্তরীণ কোয়ান্টাম ধর্ম। বুঝতে সুবিধার জন্য আমরা ঘূর্ণনের ধারণা টেনে আনি, কিন্তু প্রকৃত ঘটনা ঘূর্ণনের সঙ্গে তুলনায় দাঁড়ায় না।
তরঙ্গ-ইলেকট্রন এবং নতুন মডেলের আগমন
আরো পড়ুন
ফরাসি বিজ্ঞানী লুই দ্য ব্রগলি দেখিয়েছিলেন, যে কোনো গতিশীল বস্তুরই তরঙ্গ প্রকৃতি থাকে। তাঁর তত্ত্বই ইলেকট্রনকে তরঙ্গ-কণার দ্বৈত পরিচয় দেয়। সমস্যা হলো, তাঁর সমীকরণে ইলেকট্রন কিভাবে নিউক্লিয়াসের চারপাশে স্থিতিশীল থাকবে তা ব্যাখ্যা করা ছিল না।
শ্রোডিঙ্গার এসে সেই জট খুললেন। তিনি দেখালেন,
ইলেকট্রন কোনো কক্ষপথে ঘোরে না। বরং শক্তিস্তরের বিভিন্ন বিন্দুতে এর অবস্থানের সম্ভাবনা থাকে, কোথাও বেশি, কোথাও কম। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি যোগ করল আরও এক স্তর। যদি আপনি ইলেকট্রনের অবস্থান নিশ্চিত করতে যান, তার গতি হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। ফলে নিউক্লিয়াসের চারপাশে ইলেকট্রন ঘোরে এই ধারণা একেবারেই অচল হয়ে গেল। যেহেতু ইলেকট্রন ঘোরেই না, নিজের অক্ষের ওপর ঘোরা তো আরও দূরের কথা।
তাহলে স্পিন শব্দটির উৎপত্তি কোথা থেকে?
১৯৯৯ সালে সায়েন্টিফিক আমেরিকান একটি বিখ্যাত লেখায় দেখিয়েছিল, ইলেকট্রনের স্পিনকে পৃথিবীর আহ্নিক গতির সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়। কেন? কারণ, স্পিন শব্দটি এসেছে ক্লাসিক্যাল তড়িৎচৌম্বকতার প্রভাব দেখে। চার্জিত কোনো বস্তু ঘুরলে তার চারপাশে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়। তাই যখন দেখা গেল ইলেকট্রনও ক্ষুদ্র চুম্বকের মতো আচরণ করছে, তখন বিজ্ঞানীরা ধারণা করলেন, ইলেকট্রন নিশ্চয়ই ঘুরছে! তাই নাম দেন “স্পিন”। কিন্তু পরে কোয়ান্টাম তত্ত্ব দেখায়, কণাগুলো ঘোরে না, তবুও চৌম্বক ধর্ম দেখা যায়। নামটা রয়ে গেছে, ব্যাখ্যা বদলে গেছে।
১৯২২ সালে দুই জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী অটো স্টার্ন ও ওয়ালথার গারল্যাক সিলভার পরমাণুর বিমকে চুম্বকক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে পাঠালেন। তাঁরা দেখলেন বিম দুটি ভাগে বিভক্ত হয়েছে, একটি উপরের দিকে বেঁকে গেছে, আরেকটি নিচের দিকে। যদি ইলেকট্রনের স্পিন সত্যিই লাটিমের ঘূর্ণনের মতো হতো, তাহলে পর্দায় অসংখ্য দিকের স্তূপ দেখা যেত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল কেবল দুটি ভাগ। মানে, স্পিনের মাত্র দুটি মান, স্পিন-আপ ↑, স্পিন-ডাউন↓ এ থেকেই স্পিনের দ্বিমাত্রিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯২৪ সালে উলফগ্যাং পাউলি এই পরীক্ষার ভিত্তিতে গড়লেন তাঁর বিখ্যাত পাউলির বর্জন নীতি। শক্তিস্তরে দুটি ইলেকট্রনের প্রথম তিন কোয়ান্টাম সংখ্যা এক হলেও স্পিন অবশ্যই বিপরীত হবে। তাই জোড়া ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে একটির স্পিন-আপ, অন্যটির স্পিন ডাউন। এরপর ১৯২৫ সালে গৌডস্মিথ ও উলেনবেক স্পিন ধারণাটিকে পূর্ণ বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে প্রতিষ্ঠা দেন।
স্পিন হলো কোয়ান্টাম কণার এক অভ্যন্তরীণ ধর্ম, যা কণার চৌম্বক আচরণের মূল কারণ। এটি দৃশ্যগত ঘূর্ণন নয়। এটি কণার ভেতরের এমন এক গঠনগত বৈশিষ্ট্য, যা চোখে দেখা যায় না, কল্পনাতেও সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না। শুধু ইলেকট্রন নয়, প্রোটন, নিউট্রন, মেসন, এমনকি কোয়ার্ক পর্যন্ত সব মৌলিক কণারই স্পিন আছে।


Leave a Reply