কোয়ান্টাম গ্রিড পদ্ধতিতে অবস্থান ও ভরবেগের যুগপৎ পরিমাপ
কোয়ান্টাম গ্রিড নামক কিছু ব্যবহার করে, বিজ্ঞানীরা হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি লঙ্ঘন না করে একই সাথে ভরবেগ এবং অবস্থান পরিমাপ করার একটি চতুর উপায় খুঁজে পেয়েছেন। পদার্থবিদরা হাইজেনবার্গের আইকনিক অনিশ্চয়তা নীতি লঙ্ঘন না করেই একটি কণার ভরবেগ এবং অবস্থান উভয়ই পরিমাপ করেছেন।
কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় , কণাগুলো স্বাভাবিক বস্তুর মতো স্থির বৈশিষ্ট্যের হয় না। পরিমাপ না করা পর্যন্ত তারা সম্ভাবনার ধোঁয়ার মধ্যে থাকে। এবং যখন কিছু বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করা হয়, তখন অন্যগুলো অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা অনুসারে, একই সময়ে একটি কণার সঠিক অবস্থান এবং তার সঠিক ভরবেগ উভয়ই জানা সম্ভব নয়।
কিন্তু একটি নতুন গবেষণায় এই সীমাবদ্ধতার চারপাশে একটি চতুর ফাঁক দেখানো হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পদার্থবিদরা প্রমাণ করেছেন যে বিভিন্ন পরিমাণের উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে, যা মডুলার পর্যবেক্ষণযোগ্য নামে পরিচিত, তারা একই সাথে অবস্থান এবং ভরবেগ পরিমাপ করতে পারে।
পদার্থবিদ্যায়, বল হলো সেই শক্তি যা সময়ের সাথে সাথে ভরবেগের পরিবর্তন ঘটায় এবং অবস্থানের পরিবর্তন ঘটায়। গ্রিড প্যাটার্ন কীভাবে নড়াচড়া করে তা পর্যবেক্ষণ করে, গবেষকরা আয়নের উপর প্রভাব বিস্তারকারী ক্ষুদ্র ধাক্কা পরিমাপ করেছেন।
যদিও অর্জিত বল সর্বনিম্ন নয়, তবুও এটি প্রমাণ করে যে বিজ্ঞানীরা খুব মৌলিক সেটআপ থেকে অত্যন্ত চরম সংবেদনশীলতা পেতে পারেন। ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলো অনুভব করার ক্ষমতা বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি জুড়ে বিস্তৃত প্রভাব আছে। অতি-নির্ভুল কোয়ান্টাম সেন্সর এমন জায়গায় নেভিগেশন উন্নত করতে পারে যেখানে জিপিএস পৌঁছায় না, যেমন জলের নীচে, ভূগর্ভস্থ বা মহাকাশে। এটি জৈবিক এবং চিকিৎসা ইমেজিংও উন্নত করতে পারে।
যেমন পারমাণবিক ঘড়ি নেভিগেশন এবং টেলিযোগাযোগে বিপ্লব এনেছে, তেমনি চরম সংবেদনশীলতা সহ কোয়ান্টাম-বর্ধিত সেন্সর সম্পূর্ণ নতুন শিল্পের দরজা খুলে দিতে পারে।
কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মূল ভিত্তিগুলোর একটি হলো হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি, যেখানে বলা হয় যে একটি কণার সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং ভরবেগ একই সাথে জানা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে এটি এক অতিক্রম অযোগ্য সীমারেখা বলে মনে করা হলেও, সাম্প্রতিক গবেষণায় এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেখা দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পদার্থবিদরা প্রমাণ করেছেন, নীতি ভঙ্গ না করেও অবস্থান ও ভরবেগ একসাথে নির্ণয়ের কৌশল সম্ভব। শর্ত হলো পর্যবেক্ষণযোগ্য রাশি সরাসরি না মেপে মডুলার আকারে মাপা।
গবেষকরা বলছেন, তারা অনিশ্চয়তাকে এড়িয়ে যাননি বরং পুনর্বিন্যাস করেছেন। প্রয়োজনীয় তথ্যের উপরই কেবল মনোযোগ রেখে, অতিরিক্ত অনিশ্চয়তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি রুলার দিয়ে পরিমাপের ক্ষেত্রে মোট দৈর্ঘ্যের চেয়ে বরং ক্ষুদ্র অংশের বিচ্যুতিই মূল বিবেচনা। যেটি মডুলার মাপের সমতুল্য। গবেষকরা একটি একক আটকে থাকা আয়নের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। একটি একক চার্জযুক্ত পরমাণু যা তড়িৎ চৌম্বকীয় ক্ষেত্র দ্বারা স্থানে আটকে থাকে। তারা টিউনড লেজার ব্যবহার করে আয়নটিকে একটি কোয়ান্টাম প্যাটার্নে রূপান্তরিত করে যাকে গ্রিড অবস্থা বলা হয়।
প্রয়োগশালায় এই কৌশল পরীক্ষা করার জন্য দলটি একটি একক আয়নকে তড়িৎচৌম্বকীয় ফাঁদে আটকে রাখে এবং লেজার দিয়ে তাকে কোয়ান্টাম “গ্রিড অবস্থা”-য় রূপান্তরিত করে। এই গ্রিড অবস্থায় কণার তরঙ্গ-ফাংশন সমান ব্যবধানযুক্ত একাধিক শিখরে বিস্তৃত থাকে। ফলে, অনিশ্চয়তা মূলত শিখরের মধ্যবর্তী ফাঁকে সীমাবদ্ধ হয়। ক্ষুদ্র বল প্রয়োগ করলে সমগ্র গ্রিড প্যাটার্ন সরে যায়। শিখরের স্থানচ্যুতি অবস্থানের পরিবর্তন নির্দেশ করে, আর প্যাটার্নের সামান্য কাত ভরবেগের পরিবর্তন প্রকাশ করে। এইভাবে, উভয় পরিবর্তন একসাথে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
পরীক্ষায় প্রায় নিউটন (১০ ইয়োকটোনিউটন) মাত্রার বল সনাক্ত করা গেছে। যদিও এটি বল পরিমাপের সর্বনিম্ন রেকর্ড নয়, তবুও একক পরমাণু ব্যবহার করে এই সংবেদনশীলতা অর্জন করা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, জটিল ও ব্যয়বহুল যন্ত্র ছাড়াই অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করা যায়।
ভবিষ্যতে এই ধরণের কোয়ান্টাম সেন্সর নেভিগেশন থেকে শুরু করে চিকিৎসা-ইমেজিং পর্যন্ত বহুবিধ ক্ষেত্রে বিপ্লব আনতে পারে। যেমন পারমাণবিক ঘড়ি আধুনিক যোগাযোগ ও নেভিগেশনকে রূপান্তরিত করেছে, তেমনি অতি-সংবেদনশীল সেন্সর নতুন শিল্প ও প্রযুক্তির সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
সূত্র: livescience.com



Leave a Reply