পারদ কাঁচকে ভেজায় না কিন্তু পানি কাঁচকে ভেজায়
এই প্রশ্নটি প্রকৃতপক্ষে পৃষ্ঠটান, আঠালো বল এবং সান্দ্রতা সম্পর্কিত একটি মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের ধারণাকে নির্দেশ করে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, পারদ কাঁচকে ভেজায় না (অর্থাৎ কাঁচের পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে না) কিন্তু পানি কাঁচকে ভেজায় (ছড়িয়ে পড়ে)। এই আপাতদৃষ্টিতে সরল প্রশ্নের পিছনে রয়েছে অণু-পরমাণু স্তরের জটিল আন্তঃআণবিক বলের ক্রিয়াকলাপ, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা প্রাকৃতিক ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।
এই ঘটনা বুঝতে প্রথমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা বোঝা দরকার হবে। সংসক্তি বল – একই পদার্থের অণুগুলোর মধ্যকার আকর্ষণ বল। যেমন পানির অণুগুলো একে অপরকে আকর্ষণ করে। আঠালো বল – ভিন্ন পদার্থের অণুগুলোর মধ্যকার আকর্ষণ বল। যেমন পানির অণু ও কাঁচের অণুর মধ্যকার আকর্ষণ।
আরো পড়ুন
যে বলের প্রাধান্য থাকে (সংসক্তি না আঠালো), তা নির্ধারণ করে একটি তরল কীভাবে কোনো কঠিন পৃষ্ঠের সাথে আচরণ করবে। পারদ ও পানির আণবিক গঠন ও আন্তঃআণবিক বল। পানি (H₂O) পানির অণুটি পোলার (মেরুবিশিষ্ট), কারণ অক্সিজেন পরমাণু ঋণাত্মক আধানের দিকে এবং হাইড্রোজেন পরমাণু ধনাত্মক আধানের দিকে ঝোঁক প্রবণ। এর ফলে পানির অণুগুলো হাইড্রোজেন বন্ধনের মাধ্যমে একে অপরের সাথে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে (প্রবল সংসক্তি বল)। কিন্তু যখন কাঁচের (যা মূলত সিলিকা, SiO₂) সাথে যোগাযোগ করে, তখন পানির পোলার অণু ও কাঁচের পৃষ্ঠের পোলার অণুগুলোর (SiO₂-এর অক্সিজেন পরমাণু) মধ্যে প্রবল আঠালো বলের সৃষ্টি হয়। কাঁচ-পানির আঠালো বল, পানির নিজস্ব সংসক্তি বলকে অতিক্রম করে। ফলে পানির অণুগুলো কাঁচের পৃষ্ঠে আটকে যায় এবং পৃষ্ঠ বরাবর ছড়িয়ে পড়তে চায়। (Hg)পারদ একটি ধাতু, যার অণুগুলো (পরমাণুগুলো) ধাতব বন্ধনে আবদ্ধ। এটি অ-পোলার এবং এর সংসক্তি বল অত্যন্ত প্রবল। পারদের পরমাণুগুলোর মধ্যে ধাতব বন্ধন এতই শক্তিশালী যে তারা নিজেদের মধ্যে আকর্ষণকে অগ্রাধিকার দেয়। কাঁচের সাথে পারদের আঠালো বল নগণ্য, কারণ পারদের অ-পোলার পরমাণু ও কাঁচের পোলার পৃষ্ঠের মধ্যে আকর্ষণ খুবই দুর্বল। ফলে পারদের পরমাণুগুলো কাঁচের চেয়ে একে অপরের দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়। এজন্য পারদ কাঁচের পৃষ্ঠে গোলাকার ফোঁটার আকৃতি নেয় (ছড়ায় না) এবং সহজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
যখন কোনো তরল ফোঁটা কোনো কঠিন পৃষ্ঠের উপর থাকে, তখন তরল, কঠিন ও বায়ুর সংযোগস্থলে একটি কোণ তৈরি হয়। এই কোণই নির্ধারণ করে তরলটি পৃষ্ঠটিকে ভিজাবে কিনা। যদি সংস্পর্শ কোণ θ < 90° হয়, তরলটি পৃষ্ঠটিকে ভিজায়। আঠালো বল > সংসক্তি বল। পানি ও পরিষ্কার কাঁচের ক্ষেত্রে এই কোণ প্রায় ০°-২০° এর মধ্যে হয়, অর্থাৎ পানি সম্পূর্ণভাবে ছড়িয়ে পড়ে। যদি সংস্পর্শ কোণ θ > 90° হয়, তরলটি পৃষ্ঠটিকে ভিজায় না। সংসক্তি বল > আঠালো বল। পারদ ও কাঁচের ক্ষেত্রে এই কোণ প্রায় ১৪০°-১৫০° হয়, যা একটি সুস্পষ্ট না-ভিজানো আচরণ নির্দেশ করে।
এই কোণের মান তরল ও কঠিন উভয়ের প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। কাঁচ যদি অপরিষ্কার বা চর্বিযুক্ত হয়, তাহলে পানিও তা ভিজাতে পারবে না (θ > 90° হবে), যেমন পাতার পানির ফোঁটা। পৃষ্ঠটান হলো তরলের পৃষ্ঠ একটি প্রসারিত স্থিতিস্থাপক পর্দার মতো আচরণ করার প্রবণতা, যা তরলের পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল ন্যূনতম করতে চায়। সংসক্তি বলই পৃষ্ঠটানের জন্য দায়ী।
অত্যন্ত উচ্চ (২০°C তে ~৪৬৫ mN/m, যা পানির তুলনায় প্রায় ৬ গুণ বেশি: ~৭২ mN/m)। এই উচ্চ পৃষ্ঠটান, দুর্বল আঠালো বলের সাথে মিলিত হয়ে পারদকে একটি গোলাকার আকৃতি নিতে বাধ্য করে, যা পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল ন্যুনতম করে। পানির পৃষ্ঠটান তুলনামূলক কম এবং কাঁচের সাথে তার প্রবল আঠালো বলের কারণে, পানি কাঁচের পৃষ্ঠের সাথে যুক্ত হয়ে নিজের পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি করতে পারে (ছড়িয়ে পড়তে পারে), কারণ এতে সামগ্রিক শক্তি কমে যায়।
এই নীতিগুলো কেবল গবেষণাগারের কৌতূহলই নয়, আমাদের চারপাশের বহু ঘটনা ও প্রযুক্তির মূল ভিত্তি। মাটির কণাগুলোর (যা প্রায়শই কাঁচজাতীয়) সাথে পানির প্রবল আঠালো বলের কারণে পানি মাটির নিচে ধারণ করে থাকে, যা উদ্ভিদের জন্য অপরিহার্য। অভিকর্ষের বিরুদ্ধে কৈশিকতা কাঁচের সরু নলের (কৈশিক নল) ভেতরে পানির উপরে উঠে আসা এই একই নীতি অনুসরণ করে। আঠালো বলের কারণে পানি নলের দেওয়াল বরাবর উঠে যায় এবং সংসক্তি বল অন্য পানির অণুগুলোকেও টেনে নিয়ে আসে। পারদে এই ঘটনাটির বিপরীত ঘটে; পারদ কৈশিক নলে নিচে নেমে যায়।
সাবান পানির পৃষ্ঠটান কমিয়ে দেয়, যার ফলে এটি কাপড়ের তন্তু ও ময়লার সাথে ভালোভাবে লেগে তাকে তুলে আনতে পারে। টেফলন বা অনুরূপ প্রলেপ এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যাতে এর সাথে পানির আঠালো বল অত্যন্ত দুর্বল হয় (θ ~১২০°), ফলে খাবার লেগে থাকে না এবং পরিষ্কার করা সহজ হয়। গাছে শিশির বিন্দু জমা, কিছু পোকামাকড়ের পানি ভেদ করে হাঁটা, গাছের পাতায় পানির ফোঁটার গোলক আকার। সবই পৃষ্ঠটান ও আঠালো বলের নিয়ন্ত্রণাধীন।
পারদের এই আচরণ তার ধাতব প্রকৃতির ফল। অন্যান্য বেশিরভাগ ধাতু কক্ষ তাপমাত্রায় কঠিন থাকে, কিন্তু পারদ তরল। তারপরও এর ধাতব বন্ধনের শক্তি অত্যন্ত উচ্চ। কাঁচের সাথে এর মিথস্ক্রিয়া এতই দুর্বল যে, ঐতিহাসিকভাবে পারদকে বায়ুমণ্ডল চাপ পরিমাপের জন্য ব্যারোমিটারে ব্যবহার করা হতো। পারদের কলাম কাঁচের নলের সাথে লেগে না থেকে সহজেই ওঠা-নামা করতে পারে, যা সঠিক পাঠ নিশ্চিত করে।
একটি সহজ পরীক্ষা দ্বারা এটি বোঝা যায়। একটি পরিষ্কার কাঁচের স্লাইডের উপর এক ফোঁটা পানি ও এক ফোঁটা পারদ রাখুন। পানি সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে কাঁচের একটি অংশ ভিজিয়ে দেবে। অন্যদিকে, পারদ একটি গোলকের মতো সুস্পষ্ট ফোঁটা আকারে থেকে যাবে, কাঁচকে স্পর্শ করলেও তাকে ভিজাবে না। যদি আপনি পারদের ফোঁটাটিকে ধাক্কা দেন, এটি মুক্তভাবে গড়িয়ে যাবে, প্রায় কোনো দাগ ছাড়াই।
সুতরাং, পারদ কাঁচকে ভেজায় না কিন্তু পানি কাঁচকে ভেজায় এর মূল কারণ হলো, পানি ও কাঁচের মধ্যকার আঠালো বল, পানির নিজস্ব সংসক্তি বলের চেয়ে বেশি; কিন্তু পারদ ও কাঁচের মধ্যকার আঠালো বল, পারদের অত্যন্ত প্রবল সংসক্তি বলের চেয়ে অনেক কম। এই বলগুলোর ভারসাম্যই নির্ধারণ করে সংস্পর্শ কোণ, যা আমাদের দৃশ্যমানভাবে ভিজানো বা না ভিজানো আচরণ হিসেবে দেখা যায়। এটি পদার্থবিজ্ঞানের একটি সুন্দর উদাহরণ, যেখানে অণু-পরমাণু স্তরের অদৃশ্য আকর্ষণ বল আমাদের দৃশ্যমান বিশ্বের আচরণকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রকৃতির এই মৌলিক নীতিগুলো বোঝা আধুনিক প্রযুক্তি, যেমন মাইক্রোফ্লুইডিক্স, ন্যানোটেকনোলজি, উপকরণ বিজ্ঞান এবং জৈবপ্রযুক্তির অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


Leave a Reply