লিফটে চড়ার অভিজ্ঞতা ছোট্ট এক বিজ্ঞান ল্যাবরেটরি। কয়েক সেকেন্ডের জন্য শরীর যেন ভারী হয়ে যায়, আবার কখনো হালকা লাগে। প্রশ্নটা তাই একেবারেই বৈধ: সত্যিই কি ওজন বদলায়?

প্রথমেই পরিষ্কার করা দরকার, “ওজন” বলতে আমরা কী বুঝি। পদার্থবিজ্ঞানে ওজনের অন্তত তিনটি ব্যাখ্যা আছে। এক, আপনার ভর, অর্থাৎ শরীরে মোট পদার্থের পরিমাণ। দুই, পৃথিবীর মহাকর্ষ বল, যা আপনাকে কেন্দ্রের দিকে টানে। তিন, আপনি যে মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন, সেটি আপনাকে ওপরের দিকে কত জোরে ঠেলছে। বাস্তবে দাঁড়িপাল্লা বা ওজন মাপার মেশিন এই তৃতীয় বলটিই মাপে।
আপনি যখন স্থিরভাবে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন মহাকর্ষ আপনাকে নিচে টানে এবং মাটি সমান জোরে আপনাকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। দুই বল সমান হওয়ায় আপনি স্থির থাকেন। কিন্তু লিফট চলা শুরু করলেই দৃশ্যপট বদলে যায়।
লিফট যখন ওপরের দিকে ওঠা শুরু করে, তখন তাকে আপনার ভরসহ ওপরের দিকে ত্বরণ দিতে হয়। এই অতিরিক্ত ত্বরণ তৈরির জন্য লিফটের মেঝে আপনাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি জোরে ঠেলে দেয়। ফলে দাঁড়িপাল্লায় আপনার ওজন কিছুটা বেশি দেখায় এবং শরীর ভারী লাগে। যদি আপনার ভর ৬৮ কেজি হয় এবং লিফটের ত্বরণ প্রায় ১ মিটার/সেকেন্ড² হয়, তাহলে সাময়িকভাবে ওজন প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দেখাতে পারে।
কিন্তু লিফট যখন সমান বেগে চলতে থাকে, তখন ত্বরণ শূন্য। অর্থাৎ বাড়তি কোনো ঠেলা নেই। তখন আবার ওজন স্বাভাবিক হয়ে যায়।
এবার ভাবুন লিফট যখন ওপরে গিয়ে থামতে চায়। থামার জন্য তাকে নিচের দিকে ত্বরণ নিতে হয়, অর্থাৎ গতি কমাতে হয়। তখন মেঝের ওপরের দিকে ঠেলা কিছুটা কমে যায়। ফলে আপনি হালকা অনুভব করেন।
নিচে নামার সময় ঘটনাটি উল্টোভাবে ঘটে। নামা শুরু করার মুহূর্তে মেঝের ঠেলা কমে যায়, তাই নিজেকে হালকা লাগে। কিন্তু নিচে এসে থামার সময় লিফট আবার ওপরের দিকে জোরে ঠেলে গতি কমায়, ফলে তখন নিজেকে ভারী লাগে।
এই সাধারণ অভিজ্ঞতার পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর পদার্থবিজ্ঞান। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন, অর্থাৎ International Space Station-এ থাকা নভোচারীদের কথাই ধরুন। তারা ভাসেন, কারণ সেখানে মহাকর্ষ নেই এমন নয়। বরং পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ওপরে থেকেও পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যকর থাকে। তারা আসলে পৃথিবীর চারদিকে ক্রমাগত মুক্তপতনে আছেন, আর স্টেশনটিও তাদের সঙ্গে একইভাবে পড়ছে। ফলে মেঝে তাদের ওপরের দিকে কোনো ঠেলা দিতে পারে না, তাই তারা ওজনহীন অনুভব করেন।
এই ধারণা থেকেই Albert Einstein তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে “সমতূল্যতার নীতি” প্রস্তাব করেছিলেন। ত্বরণ ও মহাকর্ষ অনেক ক্ষেত্রে একই রকম প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
সুতরাং উত্তরটি সহজ কিন্তু দারুণ চমকপ্রদ। লিফটে আপনার ভর বা পৃথিবীর টান বদলায় না। বদলায় শুধু মেঝের ঠেলার পরিমাণ। ওপরে ওঠা শুরু করার সময় এবং নিচে নামার শেষে আপনি সবচেয়ে ভারী অনুভব করবেন। আর মাঝপথে সমান বেগে চলার সময় আপনি একদম স্বাভাবিক।
প্রতিদিনের লিফটযাত্রা আসলে পদার্থবিজ্ঞানের এক ক্ষুদ্র মঞ্চ, যেখানে কয়েক সেকেন্ডের নাটকে অভিনয় করে ত্বরণ, মহাকর্ষ আর আপেক্ষিকতা।

