James Watson


বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক কিংবদন্তি ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব জেমস ওয়াটসন। ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার জয়ী এই বিজ্ঞানী বৈজ্ঞানিক যোগাযোগের ধারাই বদলে দিয়েছিলেন।

এক সংক্ষিপ্ত পরিচয়

জেমস ডিউই ওয়াটসন ছিলেন একজন আমেরিকান আণবিক জীববিজ্ঞানী।১৯৬২ সালে ফ্রান্সিস ক্রিক ও মরিস উইলকিন্সের সাথে যৌথভাবে ডিএনএ-র গঠন ও জীবন্ত ব্যবস্থায় তথ্য স্থানান্তরে এর গুরুত্ব আবিষ্কারের জন্য তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি জিন কীভাবে কাজ করে তা উন্মোচন করেছিল এবং আণবিক জীববিজ্ঞান ও বিবর্তনমূলক ফাইলোজেনেটিক্সের মতো ক্ষেত্রের জন্ম দিয়েছিল।

ওয়াটসন ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ও বিতর্কিত এক ব্যক্তিত্ব, যিনি বিজ্ঞান কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায় তার রীতিই বদলে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন প্রথম উচ্চপর্যায়ের নোবেল বিজয়ী, যিনি সাধারণ মানুষকে বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের কঠোর প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বের এক অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও অমার্জিত ঝলক দেখিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর ৯৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

ডিএনএ-র সন্ধানে

মাত্র ১৫ বছর বয়সেশিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ওয়াটসন। শুরুতে পাখিবিশারদ হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু এরউইন শ্রোডিঙারের “What is Life?” বইটি পড়ে তিনি জানতে আগ্রহী হন, জিন আসলে কী দিয়ে তৈরি? তখন এটাই ছিল জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বংশগতির অণু হিসেবে ক্রোমোজোম (প্রোটিন ও ডিএনএ-র মিশ্রণ) পরিচিত ছিল। কিন্তু বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই বিশ্বাস করতেন, ২০ রকমের বিল্ডিং ব্লকযুক্ত প্রোটিনই সম্ভাব্য উত্তর, মাত্র চারটি বিল্ডিং ব্লকযুক্ত ডিএনএ নয়। কিন্তু ১৯৪৪-এর অ্যাভেরি-ম্যাকলিওড-ম্যাককার্টি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, ডিএনএ-ই বংশগতির বাহক। তখন থেকেই ডিএনএ বোঝার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়।

১৯৫০ সালে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিজ্ঞানে ডক্টরেট শেষ করে কোপেনহেগেনে ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করতে যান ওয়াটসন। ১৯৫১ সালে এক সম্মেলনে তিনি বায়োফিজিসিস্ট মরিস উইলকিন্সের সাথে পরিচিত হন। ডিএনএ-র আণবিক গঠন নিয়ে উইলকিন্সের বক্তৃতায় ওয়াটসন প্রথমবারের মতো ডিএনএ-রের এক্স-রে ফোটোগ্রাফ দেখেন। এতেই অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে (কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়) উইলকিন্সের সাথে কাজ শুরু করেন ডিএনএ-র গঠন বের করার জন্য। সেখানেই তিনি ফ্রান্সিস ক্রিকের সাথে দেখা করেন এবং গবেষণার সাধারণ আগ্রহ থেকে তাদের মধ্যে তাৎক্ষণিক বন্ধন গড়ে ওঠে।

অচিরেই, ১৯৫৩ সালে ‘নেচার’ জার্নালে ওয়াটসন ও ক্রিক তাদের যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। একই ইস্যুতে ডিএনএ-র গঠন নিয়ে আরও দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়, একটি মরিস উইলকিন্স এবং অন্যটি রসায়নবিদ ও এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফার রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের সহ-লেখকতায়।

ফ্রাঙ্কলিনই সেই এক্স-রে ফোটোগ্রাফ তুলেছিলেন, যাতে ডিএনএ-র গঠন বের করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য লুকিয়ে ছিল। তাঁর কাজ, ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরির সদস্যদের কাজের সাথে একত্রিত হয়ে, ১৯৬২ সালে ওয়াটসন, ক্রিক ও উইলকিন্সের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের পথ সুগম করে।

পুরস্কার

যদিও ওয়াটসন ও ক্রিক জানতেন যেফ্রাঙ্কলিনের অপরিহার্য এক্স-রে ফোটোগ্রাফ একটি অভ্যন্তরীণ ল্যাবরেটরি রিপোর্টে circulated হয়েছিল, তবুও তাদের সেই বিখ্যাত ১৯৫৩-এর গবেষণাপত্রে তারা ফ্রাঙ্কলিনের অবদানের স্বীকৃতি দেননি। ১৯৬৮ সালে, ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারের পিছনের ঘটনাগুলো নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বর্ণনা করে ওয়াটসন একটি বই প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ফ্রাঙ্কলিনের অবদানকে খাটো করে দেখান এবং লিঙ্গবাদী ভাষায় তাঁর উল্লেখ করেন। বইটির উপসংহারে তিনি ফ্রাঙ্কলিনের অবদান স্বীকার করেন বটে, কিন্তু আবিষ্কারে তাঁর ভূমিকার পূর্ণ কৃতিত্ব দিতে বিরত থাকেন।

কিছু ইতিহাসবিদ যুক্তি দেন যে, ফ্রাঙ্কলিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না দেওয়ার পিছনে একটি কারণ ছিল যে, তাঁর কাজ তখনও প্রকাশিত হয়নি এবং ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে তা “সাধারণ জ্ঞান” হিসেবে বিবেচিত হত। তবে, ফ্রাঙ্কলিনের তথ্য ব্যবহার করে এবং অনুমতি বা স্বীকৃতি ছাড়াই সেটি আনুষ্ঠানিক প্রকাশনায় অন্তর্ভুক্ত করাকে এখন বিজ্ঞান ও পেশাগত পরিবেশে নারী সহকর্মীদের প্রতি পুরুষ সহকর্মীদের আচরণের একটি কুখ্যাত উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।

নোবেল পুরস্কার প্রদানের পরের দশকগুলোতে, অনেকেই রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনকে একজন নারীবাদী আইকন হিসেবে পুনর্ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি এটি সমর্থন করতেন কিনা তা অনিশ্চিত, যেমনটা অনিশ্চিত নোবেল পুরস্কার থেকে বাদ পড়া এবং ওয়াটসনের বর্ণনায় তাঁকে হেয়প্রতিপন্ন করা সম্পর্কে তাঁর অনুভূতি। তবে, যা স্পষ্ট হয়ে গেছে তা হলো, তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য। বর্তমানে তাঁকে ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারের সমান অংশীদার হিসেবেই ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

বিজ্ঞানী সহযোগিতার ভবিষ্যৎ

ওয়াটসন ও ক্রিকের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর থেকেকনিষ্ঠ সহকর্মী ও সহযোগীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে কী পরিবর্তন এসেছে?

অনেক ক্ষেত্রে, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অর্থায়নকারী সংস্থা ও পিয়ার-রিভিউড জার্নালগুলো এখন কোনো প্রকল্পে জড়িত সকল গবেষকের কাজ ও অবদান স্বচ্ছভাবে চিহ্নিত ও কৃতিত্ব দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক নীতি বাস্তবায়ন করেছে। যদিও এই নীতিগুলো সবসময় কাজ করে না, তবুও বৈজ্ঞানিক পরিবেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার দিকে এগিয়েছে। এই বিবর্তন হয়তো এই স্বীকৃতি থেকে এসেছে যে, একজন ব্যক্তি এককভাবে খুব কমই জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা ও সমাধান করতে পারে। আর যখন সমস্যা দেখা দেয়, তখন তা নিষ্পত্তির জন্য আরও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখন বিদ্যমান।

বিজ্ঞান এখন আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। জার্নাল, পেশাদার সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর লেখক নির্দেশিকায় এখন বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো পাওয়া যায়। Accountability in Research -এর মতো জার্নালও রয়েছে যা গবেষণায় সততা প্রচারের জন্য ব্যবস্থা ও পদ্ধতির সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের জন্য নিবেদিত।

ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারের পর,জেমস ওয়াটসন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইরাস নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান এবং কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরির নেতৃত্ব দেন, যার ভৌত স্থান, কর্মী ও বিশ্বব্যাপী খ্যাতি তিনি পুনরুজ্জীবিত ও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করেন। হিউম্যান জিনোম প্রজেক্টের সূচনালগ্নে, এটিকে নেতৃত্ব দেওয়া ও এগিয়ে নেওয়ার জন্য ওয়াটসন ছিলেন এক স্বতঃসিদ্ধ পছন্দ, যদিও জিন পেটেন্ট নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের পর তিনি সে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান, জিন পেটেন্টের তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন।

তাঁর জীবদ্দশায় অপরিসীম ভালো কাজ সত্ত্বেও, ওয়াটসনের উত্তরাধিকার কলঙ্কিত হয়েছে তাঁর দীর্ঘকালের বর্ণবাদী ও লিঙ্গবাদী মন্তব্য এবং রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের প্রতি ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে অবমাননাকর মন্তব্যের কারণে। আর এটা খুবই পরিতাপের বিষয় যে, তিনি ও ক্রিক তাদের সেই মহান আবিষ্কারে যারা অবদান রেখেছিলেন, সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তাদের সকলকে স্বীকৃতি দিতে নির্বাচিত করেননি।

বিজ্ঞানী হিসেবে ওয়াটসনের কৃতিত্ব চিরস্মরণীয়, কিন্তু তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য ও আচরণ বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে রয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *