মহাকাশে ঘুরতে ঘুরতে কেউ ধীরে ধীরে বুড়ো হচ্ছে, এটা শুনতে যতটা কল্পকাহিনি মনে হয়, বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তা একেবারে বাস্তব। সময় আসলে সবার জন্য একভাবে চলে না। সময় আপেক্ষিক, এ কথা আমরা জানি আইনস্টাইনের বিশেষ ও সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের মাধ্যমে।
আপনি মহাবিশ্বের কোন জায়গায় আছেন, কতটা গতিতে চলছেন কিংবা কতটা শক্তিশালী মহাকর্ষের মধ্যে আছেন, তার ওপর নির্ভর করে আপনার জন্য সময় কতটা দ্রুত বা ধীরে এগোবে। একে বলে সময়ের প্রসারণ বা টাইম ডাইলেশন। এর সহজ উদাহরণ হিসেবে ভাবুন আপনার কাছে একটা বাজেট আছে, যেটা আপনি সময় এবং স্থানে ভ্রমণের জন্য খরচ করতে পারেন। আপনি যদি এই বাজেটের বেশি অংশ স্থানের ভ্রমণে, অর্থাৎ উচ্চ গতিতে চলার পেছনে ব্যয় করেন, তাহলে সময়ের ভ্রমণে কম খরচ করতে পারবেন। অর্থাৎ সময় আপনার জন্য ধীরে চলবে।
এই ঘটনা বাস্তবে ঘটে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা নভোচারীদের সঙ্গে। তাঁরা প্রতি ঘণ্টায় ২৮ হাজার কিলোমিটার গতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেন। ফলে তাঁদের জন্য সময় পৃথিবীর তুলনায় সামান্য ধীরে চলে। একজন নভোচারী যদি টানা এক হাজার দিন স্টেশনে থাকেন, তবে তিনি পৃথিবীর মানুষের তুলনায় ০.২৭ সেকেন্ড ভবিষ্যতে এগিয়ে থাকবেন।
এমনকি বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে বাস্তব পরীক্ষা করেছেন স্কট কেলি ও মার্ক কেলি নামের দুই যমজ ভাইয়ের ওপর। স্কট মহাকাশে এক বছর কাটিয়েছিলেন, আর মার্ক ছিলেন পৃথিবীতে। ফিরে এসে দেখা যায়, স্কটের বয়স তার ভাইয়ের তুলনায় ৫ মিলিসেকেন্ড কম বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে সময় সবাইকে সমানভাবে প্রভাবিত করে না।
এমনকি আপনি যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি গতিতে মহাকাশে ঘুরে ঘুরে দশ বছর কাটান, তখন ফিরে এসে পৃথিবীতে দেখতে পারেন পেরিয়ে গেছে কয়েক হাজার বছর। আপনজনদের কেউ আর জীবিত নেই। কারণ আপনার জন্য সময় ধীরে চললেও পৃথিবীর জন্য সময় স্বাভাবিক গতিতে বয়ে গেছে। সময়ের ওপর শুধু গতি নয়, প্রভাব ফেলে মহাকর্ষও।
যত বেশি ভর, যত শক্তিশালী মহাকর্ষ, তত ধীরে চলে সময়। যদি আপনি একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি থাকেন, তাহলে আপনার সময় পৃথিবীর তুলনায় অনেক ধীরে চলবে। তাই আপনি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবেন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা নভোচারীরা সময়ের এই দুটি ভিন্ন প্রভাবের সম্মুখীন হন। তাঁদের উচ্চ গতি সময়কে ধীরে করে আর কম মহাকর্ষ সময়কে দ্রুত করে। তবে দেখা গেছে গতির প্রভাবই বেশি কাজ করে।
এ কারণেই মহাকাশে থাকা অবস্থায় তাঁদের বয়স পৃথিবীর মানুষের তুলনায় একটু ধীরে বাড়ে। এভাবেই আপেক্ষিকতা আমাদের শেখায় সময় আসলে কতটা রহস্যময় এবং স্থান ও গতি অনুযায়ী তা কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।
তথ্যঃ BBC Science Focus


Leave a Reply