বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা এবং দূর অনুধাবন কেন্দ্র সংক্ষেপে স্পারসো (Bangladesh Space Research and Remote Sensing Organization -SPARRSO ) বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান যা ১৯৮০ সালে ঢাকা শহরের আগরগাঁও এ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের ঘূণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস প্রদানে এ কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ নামে উৎক্ষেপণ করা হলেও এখন এর নাম পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট- ১ নামে।
পটভূমি
সংস্থাটি কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবহার করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ভূমি জরিপ, পরিবেশ সংক্রান্ত গবেষণা ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত রয়েছে। উল্লেখ্য বাংলাদেশের স্যাটেলাইট ইমেজগুলো এদের তত্ত্বাবধানে থাকে। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম ভূ-সমলয় বা ভূ-স্থির যোগাযোগ কৃত্রিম উপগ্রহ। ২০১৫ সালে বিটিআরসি (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) রাশিয়ার উপগ্রহ কোম্পানি ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে কক্ষপথ (অরবিটাল প্লট) কেনার আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ স্যাটেলাইটটি তৈরি করার দায়িত্ব দেয়া হয় ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান থ্যালেস এলেনিয়া স্পেস নামক কোম্পানিকে এবং উৎক্ষেপণের দায়িত্ব দেয়া হয় স্পেসএক্সকে (SpaceX)।
স্পেসএক্স যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ফ্যালকন-৯ ব্লক-৫ রকেটে করে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (ওজন ৩.৭ টন) ১১ মে ২০১৮ তারিখে উৎক্ষেপণ করা হয় যার মধ্যদিয়ে বিশ্বের ৫৭ তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হল বাংলাদেশ। স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের পর গন্ত্যব্যে পৌঁছাতে সময় লাগে ১১ দিন এবং একে ১১৯.১০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার ভূ-স্থির স্লটে স্থাপন করা হয়। উৎক্ষেপণ করার পর ১২মে ২০১৮ তারিখে এটি পরীক্ষামূলক সংকেত পাঠাতে শুরু করে।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (প্লাটফর্ম স্পেসবাস ৪০০০ বি২) এ রয়েছে ১৬০০ মেগাহাটর্জ ক্ষমতাসম্পন্ন মোট ৪০টি কে-ইউ এবং সি-ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার (প্রতিটি ট্রান্সপন্ডার ৩৬ মেগাহার্টজ সমতুল্য) এর মধ্যে ২৬টি কে-ইউ ব্যান্ড এর আওতায় রয়েছে বাংলাদেশের সীমানাভুক্ত বঙ্গোপসাগর, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন এবং ১৪টি সি-ব্যান্ডের আওতায় রয়েছে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মায়ানমার, ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, উর্জিন্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কেমিস্তান ও কাজাখান্তানের কিছু অংশ। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা এবং স্যাটেলাইটটির মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ১৫ বছর। স্যাটেলাইটটি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরে মূল গ্রাউন্ড স্টেশন বা ভূ-কেন্দ্র ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় দ্বিতীয় ভূ-কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে।
সুবিধা
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট থেকে ৩ ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে। যথা-১) এই স্যাটেলাইটের সাহায্যে ডিটিএইচ বা ডিরেক্ট টু হোম মাল্টিপ্লেক্সড ডিজিটাল টেলিভিশন, রেডিও এবং সংশ্লিষ্ট ডেটা, যা সরাসরি খুব ছোট রেডিও অ্যানটেনাগুলোয় সরবরাহ করবে। ২) এর ব্যান্ডওইডথ ও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং সেবা, টেলিমেডিসিন ও দূরনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রসারেও ব্যবহার করা যাবে। ৩) বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়ে। তখন এর মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব।
মহাকাশ ভ্রমণে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রয়োগ
১৯৫৭ সাল থেকে কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ এবং রোবোটিক মহাকাশযানের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সৌরজগৎ সম্পর্কিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছেন। রোবোটিক মহাকাশযান চাঁদে, শুত্রগ্রহে, মঙ্গলগ্রহে, এবং মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের মধ্যবর্তী গ্রহাণুপুঞ্জে অবতরণ করে এদের সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের তথ্য সরবরাহ করেছে। তাছাড়াও রোবোটিক মহাকাশযানের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা হ্যালির ধূমকেতুসহ অন্যান্য ধূমকেতু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ছায়াপথ নক্ষত্র, গ্রহ, এবং অন্যান্য সৃষ্টিতাত্ত্বিক বিষয়বস্তুর উৎপত্তি এবং বিবর্তন সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান আরও গভীর করে তুলেছেন। এতদ্ সংক্রান্ত গবেষণায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে রোবট নিয়ন্ত্রিত মহাকাশযান বা ড্রোন ব্যবহার করে মানব কল্যাণে বিভিন্ন উপাত্ত ও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কক্ষপথীয় উপগ্রহগুলি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনেও বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করে আসছে।
বায়ুমন্ডল ও আবহাওয়া সম্বন্ধীয় উপগ্রহগুলো আমাদেরকে আবহাওয়ার বিভিন্ন ধরনের তারতম্য এবং তারতম্যের কারণ সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে। আবার কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য দ্বারা বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর ব্যবহার পদ্ধতির উন্নয়ন সাধন করেছেন। টেলিকমিউনিকেশন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমরা মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে কন্ঠস্বর, ছবি, এবং তথ্য পাঠাতে পারি। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার স্যাটেলাইটগুলো যথার্থ নৌবাহ বিজ্ঞান, অবস্থান, এবং সময় সম্পর্কিত তথ্য প্রদান করায় এই স্যাটেলাইটগুলো মানুষের পার্থিব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে কিছু কিছু দেশের মিলিটারি কর্তৃপক্ষের কাছে পৃথিবী পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইটগুলো নৌ, বিমান, ও সেনা বাহিনীর মতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অন্যতম উপাদান হল নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা যা মহাকাশ ভ্রমণকে কেন্দ্র করে উন্নত হয়েছে এবং তা মানব কল্যাণে সর্বত্র ব্যবহৃত হচ্ছে।



Leave a Reply