পৃথিবীর মূল কেবলমাত্র লোহা (Fe) দিয়ে গঠিত নয়, এর সাথে কার্বন (C) মিশ্রিত আছে বলে ধারণা করা হয় এবং গবেষণা থেকে জানা যায় যে এতে কিছু অক্সিজেন (O2) ও সম্ভবত সিলিকন (Si) বিদ্যমান। পৃথিবীর কোর বা কেন্দ্র পৃথিবীর বিবর্তনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কারণ এটি শুধু আমাদের গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র উৎপাদনে ভূমিকা রাখে না।


Earth Center Core

ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন পৃথিবীর ভূত্বকের গঠন, মহাকাশ দৃশ্যে পৃথিবীর প্রস্থচ্ছেদ। পৃথিবীর কঠিন ভেতরের মূল কেবল লোহা দিয়ে তৈরি হতে পারে না। তাহলে এতে আর কী আছে? 

আমাদের বাসযোগ্য গ্রহের কেন্দ্রে অবস্থিত লোহা সমৃদ্ধ কোর পৃথিবীর বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোরটি কেবল চৌম্বক ক্ষেত্রকেই শক্তি দেয় না। যা আমাদের বায়ুমণ্ডল, মহাসাগরের সৌর বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। এটি প্লেট টেকটোনিক্সকেও প্রভাবিত করে যা মহাদেশ ক্রমাগত পুনর্গঠন করেছে। তবুও কোরের মৌলিক বৈশিষ্ট্য যেমন এর সঠিক তাপমাত্রা, সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক উপাদান কিংবা কখন এটি জমাট বাঁধা শুরু করে এসব বিষয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও অনিশ্চিত।

অনুমান করা হয় অভ্যন্তরীণ কোরের তাপমাত্রা প্রায় ৫০০০ K (কেলভিন) বা ৪৭২৭° C (সেলসিয়াস), যা একসময় সম্পূর্ণ তরল ছিল কিন্তু ক্রমে ঠান্ডা হয়ে কঠিনে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এর ফলে বাইরের অংশের দিকে তাপ সঞ্চালিত হয়েছে যা ম্যান্টলের সঞ্চালন ও প্লেট টেকটোনিক্সকে চালিত করে। কোরের শীতলতা চৌম্বক ক্ষেত্র উৎপাদনের সাথেও সম্পর্কিত, কারণ তরল বাইরের অংশ থেকে শক্তি নির্গত হয়ে কঠিন অভ্যন্তরীণ কোরকে বৃদ্ধি করে এবং এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকম্পীয় তরঙ্গ বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোরের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।

ভূমিকম্পের শব্দ তরঙ্গ যখন গ্রহের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে, তখন তারা কোন পদার্থের মধ্য দিয়ে যায় তার উপর নির্ভর করে তাদের গতি বাড়ে এবং ধীর হয়ে যায়। ভূমিকম্প থেকে শুরু করে ভূকম্প পরিমাপক পর্যন্ত এই তরঙ্গ ভ্রমণের সময়কে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় খনিজ ও ধাতুর মধ্য দিয়ে তরঙ্গের দ্রুত ভ্রমণের সাথে তুলনা করে।

তবে কোরের ঘনত্ব বিশুদ্ধ লোহা থেকে প্রায় ১০% কম হওয়ায় বোঝা যায় যে এর সাথে অন্য উপাদানও মিশ্রিত আছে। উল্কাপিণ্ড বিশ্লেষণ থেকে জানা যায় কোরে লোহা ও নিকেলের সাথে সামান্য পরিমাণ সিলিকন বা সালফার থাকতে পারে, কিন্তু ভূকম্পবিদ্যা আরও সূক্ষ্ম তথ্য দেয় যেখানে দেখা যায় বিশুদ্ধ লোহা দিয়ে এ বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। 

তরল ধাতুর পরমাণু কীভাবে একত্রিত হয়ে কঠিন পদার্থ তৈরি করে তা অনুকরণ করে এমন গবেষণায় দেখা গেছে যে কিছু সংকর ধাতুর জন্য অন্যদের তুলনায় বেশি তীব্র সুপারকুলিং প্রয়োজন হয়। সুপারকুলিং হলো যখন কোনো তরলকে তার গলিত তাপমাত্রার নীচে ঠান্ডা করা হয় । সুপারকুলিং যত তীব্র হবে, তত বেশি পরমাণু একত্রিত হয়ে কঠিন পদার্থ তৈরি করবে, যার ফলে তরল দ্রুত জমাট বাঁধবে। আপনার ফ্রিজে রাখা একটি পানির বোতলকে হিমায়িত হওয়ার আগে কয়েক ঘন্টা ধরে -5°C তাপমাত্রায় সুপারকুল করা যেতে পারে, যেখানে মেঘের মধ্যে জলের ফোঁটা -30°C তাপমাত্রায় ঠান্ডা হলে কয়েক মিনিটের মধ্যে শিলাবৃষ্টি তৈরি হয়।


সাম্প্রতিক খনিজ পদার্থবিদ্যা গবেষণায় সুপারকুলিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে বিশুদ্ধ লোহা জমাট বাঁধতে প্রায় ১০০০° C সেলসিয়াস অতিরিক্ত শীতলতা প্রয়োজন, যা অসম্ভব এবং বাস্তবে পুরো কোরকে জমাট বাঁধিয়ে ফেলত। সিলিকন(Si) বা সালফার(S) যোগ করলে এই প্রয়োজনীয় শীতলতা আরও বৃদ্ধি পায়, ফলে বৈজ্ঞানিকভাবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু কার্বনের উপস্থিতি এখানে একটি কার্যকর সমাধান দেয়; যদি কোরে প্রায় ২.৪% কার্বন (C) থাকে তবে ৪২০° C সেলসিয়াস সুপারকুলিং যথেষ্ট হয় এবং যদি কার্বনের পরিমাণ ৩.৮% হয় তবে প্রয়োজনীয় শীতলতা কমে ২৬৬° C (সেলসিয়াস) এ নেমে আসে, যা তুলনামূলকভাবে সম্ভাব্য। এভাবে প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হয়েছে যে কার্বনের উপস্থিতি অভ্যন্তরীণ কোরের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে শুধুমাত্র লোহা ও কার্বন দিয়ে কোরের সমস্ত ভূকম্পীয় বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা যায় না, এজন্য আরও অন্তত একটি উপাদানের প্রয়োজন হয়, যেখানে অক্সিজেন ও সিলিকনের উপস্থিতি সবচেয়ে সম্ভাব্য। এই আবিষ্কার কেবল পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন নয় বরং এর তাপীয় ইতিহাস ও ভৌত-রাসায়নিক বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

তথ্যঃ লাইভ সায়েন্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *