১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। তাঁরা দেখতে পান, আমাদের বিশাল মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, বরং এর প্রসারণের বেগ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ বাড়ছে। এই রহস্যময় ঘটনার পেছনে কাজ করছে বলে ধারণা করা হয় একটি অদ্ভুত শক্তি, যার নাম দেওয়া হয়েছে ডার্ক এনার্জি বা গুপ্ত শক্তি। কিন্তু আড়াই দশক পার হয়ে যাওয়ার পরও পদার্থবিজ্ঞানের একটি বড় রহস্য এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। মহাবিশ্ব ঠিক কত বেগে প্রসারিত হচ্ছে, তার নিখুঁত হিসাব করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বিপাকে পড়ছেন। এই সমস্যার একটি নামও আছে, হাবল টেনশন। আশার কথা হলো, বিজ্ঞানীরা এখন মহাকাশ ও সময়ের বুকে তৈরি হওয়া অতি ক্ষুদ্র ঢেউ, অর্থাৎ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে এই রহস্য সমাধানের নতুন একটি পথ খুঁজে পেয়েছেন।

মহাবিশ্বের প্রসারণের হার মাপার জন্য বিজ্ঞানীরা একটি ধ্রুবক ব্যবহার করেন, যার নাম হাবল কনস্ট্যান্ট বা হাবল ধ্রুবক। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ধ্রুবকের মান নির্ণয় করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন ফল পাচ্ছেন। যদি কাছাকাছি বা বর্তমান মহাবিশ্বের পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করা হয়, তবে এক ধরনের মান পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে টাইপ ১এ সুপারনোভা নামের বিশেষ ধরনের মৃত নক্ষত্রের বিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণ করে হিসাব করা হয়। কিন্তু যদি অনেক দূরের, অর্থাৎ একদম প্রাচীন মহাবিশ্বের তথ্য ব্যবহার করা হয়, তবে পাওয়া যায় ভিন্ন একটি মান। বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরুন, আপনি একটি গাড়ির গতি মাপছেন। গাড়ির স্পিডোমিটার বলছে গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার, কিন্তু জিপিএস বলছে গতি ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার। দুটি যন্ত্রই অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য, তবু ফল ভিন্ন। এই দুই ফলাফলের দ্বন্দ্বকেই বিজ্ঞানীরা বলেন হাবল টেনশন। তাই বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই এমন একটি তৃতীয় পদ্ধতির খোঁজ করছিলেন, যা দিয়ে বোঝা যাবে আসল মান কোনটি।
এই নতুন সম্ভাবনার সূত্র এসেছে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ থেকে। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ধারণা প্রথম আসে ১৯১৫ সালে, আলবার্ট আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিকতা তত্ত্ব থেকে। আইনস্টাইন ব্যাখ্যা করেছিলেন যে মহাবিশ্বের স্থান-কাল বা স্পেসটাইমকে একটি প্রসারিত চাদরের মতো ভাবা যায়। এই চাদরের ওপর যদি কোনো ভারী বস্তু, যেমন গ্রহ বা নক্ষত্র রাখা হয়, তবে সেটি চাদরটিকে কিছুটা দেবে দেয়। এই দেবে যাওয়ার ফলেই সৃষ্টি হয় মহাকর্ষ বল। কিন্তু যখন দুটি ব্ল্যাকহোলের মতো অত্যন্ত ভারী বস্তু একে অপরকে ঘিরে প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকে বা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন স্পেসটাইমের সেই চাদরে পুকুরে ঢিল ছোড়ার মতো ঢেউ তৈরি হয়। আলোর বেগে ছুটে চলা এই ঢেউগুলোকেই বলা হয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লাইগো মানমন্দির প্রথমবারের মতো এই তরঙ্গ শনাক্ত করে ইতিহাস গড়েছিল। প্রায় ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে দুটি ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ থেকে উৎপন্ন সেই ঢেউ পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছিল। এরপর লাইগো, ভার্গো ও কাগরা ডিটেক্টর একসঙ্গে কাজ করে ব্ল্যাকহোল ও নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ থেকে তৈরি বহু মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করেছে।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে হাবল ধ্রুবক নির্ণয়ের ধারণা নতুন নয়, তবে আগে এতে যথেষ্ট সূক্ষ্মতা ছিল না। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইন এবং ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর গবেষকেরা এ ক্ষেত্রে একটি নতুন পদ্ধতি প্রস্তাব করেছেন। ইলিনয় সেন্টারের গবেষক নিকোলাস ইউনেস এবং শিকাগো ইউনিভার্সিটির ড্যানিয়েল হোলজ এই পদ্ধতির নাম দিয়েছেন স্টোকাস্টিক সাইরেন মেথড। এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা কেবল কাছাকাছি কোনো নির্দিষ্ট ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের সংকেত শোনার চেষ্টা করবেন না, বরং তাঁরা মহাবিশ্বের পেছনের একটি সম্মিলিত গুনগুন শব্দ শনাক্ত করার চেষ্টা করবেন। বিষয়টি অনেকটা বড় কোনো অনুষ্ঠান বা ভিড়ের জায়গার মতো। কাছাকাছি মানুষের কথা স্পষ্ট শোনা গেলেও দূরের অসংখ্য মানুষের কথার সম্মিলিত শব্দ একটি গুনগুন আওয়াজ তৈরি করে। ঠিক তেমনি মহাবিশ্বের বহু দূরের অসংখ্য ব্ল্যাকহোল সংঘর্ষ মিলেও তৈরি করে এক ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড মহাকর্ষীয় তরঙ্গ।
গবেষক দলের সদস্য কাজিনস দেখিয়েছেন, হাবল ধ্রুবকের মান যদি কম হয়, তবে মহাবিশ্বের আয়তন তুলনামূলক ছোট হবে। তখন ছোট জায়গার মধ্যে ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের ঘনত্ব বেশি হবে এবং সেই সম্মিলিত গুনগুন শব্দ তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী হবে। বিপরীতে, যদি হাবল ধ্রুবকের মান বেশি হয়, তবে মহাবিশ্বের আয়তন বড় হবে এবং সংঘর্ষগুলো অনেক দূরে দূরে ঘটবে। ফলে ব্যাকগ্রাউন্ডের সেই গুনগুন শব্দ অনেক দুর্বল হবে। লাইগো-ভার্গো-কাগরা ডিটেক্টরের বর্তমান ডেটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এখনো সেই ব্যাকগ্রাউন্ড সিগন্যাল শক্তভাবে ধরা পড়েনি। এর অর্থ হতে পারে মহাবিশ্বের আয়তন বেশ বড় এবং হাবল ধ্রুবকের মানও তুলনামূলক বেশি, অর্থাৎ মহাবিশ্ব দ্রুতগতিতে প্রসারিত হচ্ছে।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গের এই ধারণাগত ছবির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের প্রসারণের হার সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। গবেষণাটি সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Physical Review Letters-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, এটি আপাতত একটি প্রুফ অব কনসেপ্ট বা ধারণাগত প্রমাণ মাত্র। তবে আগামী ছয় বছরের মধ্যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকারী ডিটেক্টরগুলো আরও উন্নত ও সংবেদনশীল হয়ে উঠবে। তখন হয়তো মহাবিশ্বের ওই আদিম ব্যাকগ্রাউন্ড গুনগুন শব্দ সহজেই ধরা পড়বে। আর তখনই বিজ্ঞানীরা হাবল ধ্রুবকের একটি নির্ভুল মান নির্ধারণ করতে পারবেন এবং হয়তো শেষ পর্যন্ত সমাধান হবে পদার্থবিজ্ঞানের বহুল আলোচিত হাবল টেনশন সমস্যার।

