গ্লোবাল ভিলেজের ধারণা থেকেই গড়ে উঠেছে আধুনিক শিক্ষা প্রযুক্তি। শিক্ষা ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শিক্ষাকে সবার দোরগোঁড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন ইচ্ছা করলে যে কেউ বাংলাদেশে বসে অন্য যে কোন দেশের বিখ্যাত লাইব্রেরি থেকে বই পড়তে পারেন। আজকাল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি কিংবা গবেষণা কর্ম সাথে সাথে ইন্টারনেটে প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে। অনলাইন বা ই-লার্নিং পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা এখন ক্লাসে উপস্থিত না থেকেও পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিভিন্ন ডিগ্রী অর্জন করতে পারছে। এছাড়াও বর্তমানে স্মার্টফোন বা মোবাইল ফোন ইন্টারনেট এনাবল হওয়ায় সহজেই শিক্ষার যাবতীয় তথ্য জানা যায়। বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমেও শিক্ষার বিভিন্ন তথ্য সম্প্রচারিত হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে শিক্ষার সর্বক্ষেত্রেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। শিক্ষা ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ভূমিকাসমূহকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। এখানে প্রধান ৫টি ভাগ আলোচনা করা হলো-


ICT Effects on Education

বিষয়বস্তুঃ 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের পাঠ্যক্রম ও ধ্যান ধারণা পর্যবেক্ষণ করে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, আর্থিক ও মানসিক দিক বিবেচনা করে আমাদের উপযোগী করে পাঠ্যক্রম তৈরি করা যায়। পাঠ্যক্রমের বিষয়বস্তুর উপর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার্থীরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ই-মেইল, ডকুমেন্ট প্রসেসিং, স্প্রেডশীট বিশ্লেষণ ইত্যাদি ব্যবহার করতে শেখে এবং সেই সাথে শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ্য বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট এসাইনমেন্ট তৈরিতে কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তির প্রয়োগ করে।

পাঠদান পদ্ধতি – শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহণঃ 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নতুন নতুন মাধ্যমের সূচনা করেছে যা পূর্বের মাধ্যম থেকে অনেক শক্তিশালী ও কার্যকর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মত বাংলাদেশেও এখন প্রাথমিক পর্যায় থেকে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালু হয়েছে। ফলে ছবি, অডিও-ভিডিও, অ্যানিমেশন ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার বিষয়বস্তুকে অধিক আর্কষণীয়, সহজবোধ্য এবং জ্ঞান নির্ভর করে উপস্থাপন করা যাচ্ছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুমের মাধ্যমে শিক্ষকরা কোন কিছু পড়ানোর সময় উদাহরণ, চিত্র, আধুনিক তথ্য প্রভৃতি ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগ্রহ করে তা প্রদর্শন করতে পারেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারে শিক্ষাদান অনেক সহজ, সময় ও অর্থ সাশ্রয়ী। পূর্বে বোর্ডে চিত্র একে বুঝাতে অনেক সময় ব্যয় হতো এবং ছবিও সুন্দর হতো না। বর্তমানে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও কম্পিউটারে স্লাইড (Slide) বা অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহারে একাধিক নিখুঁত বোধগম্য ছবি বা শিক্ষামূলক ভিডিও ব্যবহার করে শিক্ষাদান সম্ভব। আবার লেকচার তুলতে গিয়ে ছাত্র ছাত্রীরা সব পড়া বুঝতে পারত না। বর্তমানে সহজেই তারা লেকচার এর কপি পেতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা ক্লাসের শুরুতেই লেকচার এর কপি Online এ অথবা ছাত্রদের সরাসরি দিয়ে দেয়, যার ফলে তারা সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পড়া বুঝতে পারে। শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল হোয়াইট বোর্ড বা ইলেকট্রনিক হোয়াইট বোর্ড ব্যবহারের ফলে পাঠদানের সময় বোর্ডের শিক্ষকের লেখা শিক্ষার্থী পেন ড্রাইভ বা অনলাইনে কপি করে অথবা প্রিন্ট করে নিতে পারেন। আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুমে মাল্টিমিডিয়ার প্রজেক্টরের সাথে ডিজিটাল হোয়াইট বোর্ডও ব্যবহার করা হয়। এতে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের সকল সুবিধাসহ অন্যান্য আরো অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। যেমন শিক্ষক বোর্ডে যা লিখবেন ক্লাশ শেষে তা কপি করা বা প্রিন্ট করা যায়।

শিক্ষকরা এখন বিভিন্ন বিষয়ের ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি করে ওয়েব সাইটে আপলোড করছেন। ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা যে কোন জায়গা থেকেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা ডাউনলোড করে পড়তে পারছে। তাছাড়া ই-বুকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বইয়ের ডিজিটাল ভার্সণ কম্পিউটার বা স্মার্ট ফোনে নিয়ে পড়াশুনা করতে পারে। ইবুক বা ইলেকট্রনিক বুক বলতে ডিজিটাল ফর্মে টেক্সট বা লেখা, চিত্র ও ড্রয়িং ইত্যাদি সমৃদ্ধ ডকুমেন্ট বা বইকে বুঝায় যা কোন কম্পিউটার, ট্যাব, ই-বুক রিডার ও স্মার্ট ফোন ইত্যাদি ব্যবহার করে পড়া সম্ভব। মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত প্রায় সকল টেক্সট বইয়েরই ই-বুক তৈরি করা হয়েছে। www.nctb.gov.bd ওয়েবসাইটে বিনামূল্যে এই ই-বুকগুলো পাওয়া যায়। ই-বুক আবিষ্কারকের নাম নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। তবে অনেকে মাইকেল হার্ট (Michael Hart) কে ই-বুকের জনক মনে করেন। এছাড়া অনলাইন লাইব্রেরি থেকে বই গবেষণাপত্র বা প্রবন্ধ পড়া যায়, অনেক ক্ষেত্রে এর জন্য কোন মূল্যও দিতে হয় না। ফলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্র এখন অনেক বিস্তৃত। আর বিভিন্ন জায়গা থেকে আহরণ করে কোন কাজ তৈরি করে বলে শিক্ষার্থীদের কাজের মধ্যে স্বতন্ত্রতা পরিলক্ষিত হয় যা আগে ছিল না। শিশুদের অক্ষর চিনা ও পড়া শেখা, বানান শেখা, অংক করতে শেখা, তাছাড়া আকার, রং প্রভৃতি শেখার জন্য এবং অনুশীলন করার জন্য বিভিন্ন অ্যানিমেশন সফটওয়্যার রয়েছে যা সাধারণত অনেক আকর্ষণীয় হয় ফলে অধিক কার্যকর দেখা যায়। বাংলাদেশে শুধুমাত্র শিক্ষার উপরই অনেক ওয়েব সাইট তৈরি হয়েছে। এসব ওয়েব সাইটে প্রচুর পরিমাণে,

কনটেন্ট রয়েছে যা থেকে যে কোন শিক্ষার্থীর পক্ষে যে কোন বিষয়ের উপর জ্ঞান অর্জন করা খুবই সহজ হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের ই-তথ্য কোষের ওয়েব সাইটের শিক্ষা পাতাতেও অনেক কনটেন্ট রয়েছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে দূরশিক্ষণ বা ডিসটেন্স লার্নিং (Distance Learning) এর সাহায্যে ঘরে বসে পড়াশুনা বা ডিগ্রী নেওয়া সহজতর হয়েছে। করোনা মহামারির সময় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এই ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে। বর্তমানে ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিখন ও শেখানোর কার্যক্রম পরিচালনা করাকে ই লার্নিং বলা হয়। ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে অনলাইনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইভ ক্লাসেও অংশ নেওয়া যায়।

Brain Grow in ICT Education



অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ও ভিডিও কনফারেন্সিং এর সাহায্যে ক্লাস নিয়ে থাকে। তবে এসব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদেরকে প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এই ধরনের অনলাইন এডুকেশনে বিশ্বের যে কোন স্থান হতে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে ভার্চুয়াল ক্লাসে অংশগ্রহণ করা বা সময়মত পরীক্ষাও দেওয়া যায়।

আমাদের দেশে করোনা মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষার প্রচলন ঘটে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকরা ক্লাশে বিভিন্ন ওয়েব সাইটের নাম ও ঠিকানা দিয়ে দেয়। এগুলো ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান আহরণ, বিশ্লেষণ দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস বৃদ্ধি পায়।


বর্তমান বিশ্বে জ্ঞানের প্রধান তথ্য ভান্ডার বা মুক্ত বিশ্বকোষ হিসাবে উইকিপিডিয়াকে বিবেচনা করা হয়। উইকি হলো হাওয়াইয়ান ভাষার একটি শব্দ যার অর্থ ছোট ছোট পায়ে হাটা। যেহেতু উইকিপিডিয়া সারাবিশ্বের বিভিন্ন মানুষের ছোট ছোট অবদানের মাধ্যমে আজ এক বিশাল নলেজ পোর্টালে পরিণত হয়েছে এজন্য এর এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। বর্তমানে যে কোন বিষয়ে তথ্য জানার প্রয়োজনে উইকিপিডিয়ার সাহায্য গ্রহণ করা হয়। জিমি ওয়েলস এবং ল্যারি স্যাঙ্গার ২০০১ সালের ১৫ জানুয়ারি এটি প্রতিষ্ঠা করলেও বর্তমানে উইকিপিডিয়া ফাউন্ডেশন নামের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের দ্বারা এটি পরিচালিত হচ্ছে। তাছাড়া জ্ঞান আহরণের জন্য বর্তমানে ইন্টারনেটে অসংখ্য ওয়েবসাইট রয়েছে যেখান থেকে ইচ্ছামতো শিখার সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষার্থীর মেধার মূল্যায়ন ও ফলাফল প্রকাশঃ 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীর ফলাফল নির্ণয় ও প্রকাশের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সমষ্টি নির্ণয়, প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী গ্রেড নির্ণয়, প্রাপ্ত নম্বর বা নাম অনুযায়ী সাজানো, নম্বরের ভিত্তিতে মন্তব্য একক ও সাধারণ বা রিপোর্ট তৈরি প্রভৃতি কাজ অতি সহজে ও অতি দ্রুত করা সম্ভব। বর্তমানে শিক্ষাবোর্ডসহ সকল প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীর ফলাফল তৈরিতে আইসিটি ব্যবহার করছে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। বর্তমানে কম্পিউটারের মাধ্যমে বিভিন্ন পরীক্ষা মূল্যায়ন করা হয়। কম্পিউটার একটি প্রশ্ন উপস্থাপন করে, উত্তরটিকে বিশ্লেষণ করে এবং এরপর পূর্বের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে পরের প্রশ্ন উপস্থাপন করে। এই মূল্যায়নটি শুধুমাত্র শিক্ষার্থীর সাথে কম্পিউটারের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে শিক্ষকও শিক্ষার্থীর উন্নতি সম্পর্কে অবহিত হন। আমাদের দেশের প্রতি বছরের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলগুলো ইন্টারনেটে সংরক্ষিত থাকে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভর্তির সময় সরাসরি ইন্টারনেট থেকে ফলাফলকে চেক করা হয়। এতে করে অর্থ ও সময়ের সাশ্রয় হয় এবং প্রতারণা থেকেও নিরাপদ থাকা যায়। অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এবং ফলাফলের ভিত্তিতে বিভিন্ন গ্রেড প্রদান করা হয়। এসব পরীক্ষাগুলো খুব অল্প খরচেই স্বল্পতম সময়ে দেওয়া যায়। IELTS, SAT, GMAT, TOEFL ইত্যাদি পরীক্ষাসমূহ সম্পূর্ণ কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে গ্রহণ করা হয়।

শিক্ষকদের পেশাদারি দক্ষতা বৃদ্ধিঃ

শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব বৃদ্ধিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ভূমিকা অনিবার্য। পাঠ্যক্রম তৈরি, শিক্ষাদানের তথ্য সংগ্রহ, মূল্যায়ন ও ফলাফল প্রকাশ, শিক্ষাদানের দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষাদানে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার, বিভিন্ন এলাকার শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের সাথে যোগাযোগ ও একে অপরের মতামত শেয়ার করা এবং অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থাপনাঃ 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি থেকে শুরু করে ফলাফল প্রকাশ করে সার্টিফিকেট দেওয়া এবং পরবর্তীতে তা সংরক্ষণ করা পর্যন্ত সকল ধাপের কার্যক্রমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *