১৯০১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইটালিয়ান পদার্থবিদ গুলিয়েলমো মার্কোনি জাহাজ থেকে সমুদ্র উপকূলে মোর্শ কোড ব্যবহার করে সর্বপ্রথম বেতার বা ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফের মাধ্যমে যোগাযোগ সফল করেন। তবে তারপূর্বে ১৮৯৯ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজের অধ্যাপক বাংলাদেশী বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু রেডিও তরঙ্গ গ্রহণকারী যন্ত্র আবিষ্কার করেন।
এই জন্য ১৯৯৭ সালে ইন্সটিটিউট অফ ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রোনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (IEEE) তাঁকে রেডিও বিজ্ঞানের জনক হিসাবে আখ্যায়িত করে। ১৯০১ সাল থেকেই বেতার মাধ্যম ব্যবহার হয়ে আসছে। বর্তমানে বেতার বা তারবিহীন মাধ্যম মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে গেছে। এই পদ্ধতিতে তার বা ক্যাবল ছাড়াই বৈদ্যুতিক সংকেত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন বা বিভিনাসের মাধ্যমে বায়ু মাধ্যমে সকল দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
এই জন্য একে আনগাইডেড মিডিয়াও বলা হয়। কোন প্রকার তার বা ক্যাবলের বাহ্যিক সংযোগ ব্যবহার না করেই তথ্য আদান প্রদানের জন্য যে মাধ্যমে ব্যবহার করা হয় তাকেই ওয়্যারলেস মিডিয়া বলে। সাধারণত বায়ু মাধ্যমকেই ওয়্যারলেস মিডিয়া হিসাবে ব্যবহার করা হয়।
ওয়্যারলেস মিডিয়াতে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন বা বিকিরণের মাধ্যমে ডেটা আদান-প্রদান করা হয়। বেশিরভাগ ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন সূর্য থেকে পৃথিবীতে দৃশ্যমান আলোর মাধ্যমে আসে। আলো বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সীর তরঙ্গ দ্বারা সৃষ্টি হয়। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম হলো ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণ বা রেডিয়েশনের সম্ভাব্য সকল ফ্রিকোয়েন্সীর সমাহার। নিচে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রামের সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়া হলো।
এই ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রামের নিম্নলিখিত তিনটি মাধ্যমে ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন সম্পন্ন হয়
১. রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি কমিউনিকেশন ওয়াইড-রেঞ্জ কমিউনিকেশন।
২. মাইক্রোওয়েভ কমিউনিকেশন মিডিয়াম-রেঞ্জ কমিউনিকেশন।
৩. ইনফ্রারেড (Infrared-IR): শর্ট-রেঞ্জ কমিউনিকেশন।
বেতার তরঙ্গ বা রেডিও ওয়েভ
৩ কিলোহার্টজ থেকে ৩০০ গিগাহার্টজের মধ্যে সীমিত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রামকে বলা হয় রেডিও ওয়েভ। যদিও কার্যত ১০ কিলোহার্টজ থেকে ১ গিগাহার্টজের রেডিও ওয়েবের ব্যবহার দেখা যায়। রেডিও ওয়েভ সহজে তৈরি করা যায় যা অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে এবং বিল্ডিংকেও ভেদ করতে পারে। একারণে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘরে ও বাইরে ব্যাপকভাবে রেডিও ওয়েভ ব্যবহার করা হয়। এই যোগাযোগ ব্যবস্থায় সংকেত প্রেরণের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৬৪ কিলোবিটস (Kbps)।
রেডিও কমিউনিকেশন সিস্টেমে রেডিও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এক স্থান হতে অন্য স্থানে বৈদ্যুতিক সংকেত বা সিগনাল পাঠানো যায়। রেডিও যন্ত্রপাতি বলতে রেডিও ট্রান্সমিটার, রেডিও রিসিভার, এন্টেনা এবং উপযুক্ত টার্মিনাল যন্ত্রপাতি ইত্যাদিকে বুঝায়। রেডিও কমিউনিকেশন সিস্টেমে রেডিও কমিউনিকেশন সিস্টেমে রেডিও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এক স্থান হতে অন্য স্থানে বৈদ্যুতিক সংকেত বা সিগনাল পাঠানো যায়। রেডিও যন্ত্রপাতি বলতে রেডিও ট্রান্সমিটার, রেডিও রিসিভার, এন্টেনা এবং উপযুক্ত টার্মিনাল যন্ত্রপাতি প্রধানত এএম ব্রডকাস্ট, এফএম ব্রডকাস্ট ও মাইক্রোওয়েভ ব্রডকাস্ট নামক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
পাহাড়-পর্বত বা বাঁধাযুক্ত কিংবা দূরবর্তী কোন স্থানের সাথে যোগাযোগের জন্য টাওয়ার বসিয়ে ট্রান্সমিটার থেকে সিগন্যাল পাঠানো হয়। ‘সেই সিগন্যাল বায়ুমন্ডলের আয়োনোস্ফিয়ারে বাঁধা পেয়ে গন্তব্যের রিসিভারে গৃহীত হয়।
রেডিও ওয়েভ দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত এবং অপরটি হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত। নিয়ন্ত্রিত রেডিও ওয়েভসরকারের অনুমতি ব্যতিত কেউ ব্যবহার করতে পারে না। অপরদিকে অনিয়ন্ত্রিত রেডিও ওয়েব সরকারের অনুমতি ছাড়াই যে কেউ ব্যবহার করতে পারে।
রেডিওতে যেমন বেতার তরঙ্গ দ্বারা সংকেত পাঠানো হয়, দু’টি কম্পিউটারের মধ্যেও তেমন বেতার তরঙ্গ দ্বারা যোগাযোগ সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রতিটি কম্পিউটারকে একই ফ্রিকোয়েন্সীতে টিউন বা সেট করতে হয়।
রেডিও ওয়েভের কিছু ব্যবহার
১. রেডিও বা বেতার যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়।
২. টেলিকমিউনিকেশনে ফোন বা মোবাইল যোগাযোগের লিংক স্থাপনে ব্যবহৃত হয়।
৩. ইন্টারনেট সংযোগের জন্য টাওয়ার টু টাওয়ার রেডিও লিংক ব্যবহার করা হয়।
৪. কম্পিউটার নেটওয়ার্ক তৈরিতে রেডিও ওয়েব ব্যবহৃত হয়।
৫. টেলিভিশন ব্রডকাস্টিং বা সম্প্রচার ব্যবস্থায়ও রেডিও ওয়েব ব্যবহৃত হয়।
৬. রাডারসহ বিমান ও নৌযানের বিভিন্ন নেভিগেশন সিস্টেমে রেডিও ওয়েব ব্যবহৃত হয়।
রেডিও ওয়েভ ব্যবহারের সুবিধা
১. রেডিও ওয়েভ বায়ুমন্ডলের আয়োনোস্ফিয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বিধায় পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়।
২. রেডিও ওয়েভের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য অনেক বেশি হওয়ার এই ওয়েভে ইন্টারফারেন্স তুলনামূলকভাবে কম হয়।
৩. কোন প্রকার মাধ্যম বা তারের প্রয়োজন হয় না।
৪. প্রতিকূল পরিবেশ বা বৈরি আবহাওয়ারও রেডিও যোগাযোগ কার্যকর থাকে।
রেডিও ওয়েভ ব্যবহারের অসুবিধা
রেডিও ওয়েভের ফ্রিকোয়েন্সী কম হওয়ায় এক সাথে বেশি ডেটা ট্রান্সমিট করতে পারে না। রেডিও ওয়েভ মানুষের শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।


Leave a Reply