দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পারমাণবিক প্রযুক্তির বিকাশ মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক বিশাল মোড় এনে দেয়। এই প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল ইউরেনিয়াম ধাতুকে গ্যাসীয় অবস্থায় রূপান্তর করা এবং তার আইসোটোপ পৃথকীকরণের মাধ্যমে পারমাণবিক বোমা তৈরি। ইউরেনিয়াম একটি প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় ধাতু, যার প্রধান দুটি আইসোটোপ হলো ইউরেনিয়াম-২৩৫ (²³⁵U) এবং ইউরেনিয়াম-২৩৮ (²³⁸U)। প্রকৃতিতে এই দুটি আইসোটোপ একত্রে মিশ্রিত অবস্থায় পাওয়া যায়, যেখানে ²³⁵U এর পরিমাণ মাত্র ০.৭% এবং বাকি ৯৯.৩% হলো ²³⁸U। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র কিংবা নিউক্লিয়ার পাওয়ার স্টেশনে জ্বালানিরূপে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হয় মূলত ²³⁵U, কারণ একমাত্র এই আইসোটোপই তড়িৎচালিত নিউক্লিয়ার ফিশনে অংশগ্রহণ করে বিস্ফোরক শক্তি তৈরি করতে পারে।
তবে সমস্যা হলো, এই দুই আইসোটোপের রাসায়নিক ধর্ম প্রায় এক হলেও তাদের ভর কিছুটা আলাদা। এই সামান্য ভরের পার্থক্যই প্রযুক্তিগতভাবে ব্যবহৃত হয় আইসোটোপ পৃথকীকরণের জন্য। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘ম্যানহ্যাটন প্রকল্পে’ ইউরেনিয়াম ধাতুকে একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড (UF₆) গ্যাসে রূপান্তরিত করা হয়। এই গ্যাসটি অপেক্ষাকৃতভাবে সহজে বাষ্পে পরিণত হয় এবং এটি একটি তেজস্ক্রিয় গ্যাস হলেও প্রযুক্তিগত কারণে এটি ব্যবহার উপযোগী।
UF₆ গ্যাসের সন্নিহিত দুটি আইসোটোপ, যেমন ²³⁵UF₆ এবং ²³⁸UF₆ এর আণবিক ভর যথাক্রমে ৩৪৯ amu এবং ৩৫২ amu। এই ভরের সামান্য পার্থক্য ব্যাপন প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো হয়। ব্যাপন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যেখানে গ্যাসীয় কণাগুলো উচ্চ ঘনত্ব থেকে নিম্ন ঘনত্বের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ায় হালকা গ্যাসের কণাগুলো অপেক্ষাকৃত দ্রুত গতি সম্পন্ন হয় এবং কোনো সছিদ্র (porous) মেমব্রেন বা ফিল্টারের মাধ্যমে পার হওয়ার হার তুলনামূলক বেশি হয়।
UF₆ গ্যাসকে একটি সছিদ্র মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করানো হয়, যেখানে হালকা ²³⁵UF₆ কণাগুলো দ্রুত গতি সম্পন্ন হওয়ায় বেশি সংখ্যক কণা মেমব্রেন পেরিয়ে যায়। অপরদিকে অপেক্ষাকৃত ভারী ²³⁸UF₆ এর গতি ধীর হওয়ায় তা তুলনামূলক কম পরিমাণে ফিল্টার পেরিয়ে আসে। দীর্ঘ এবং ধারাবাহিকভাবে এই পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইউরেনিয়াম-২৩৫ সমৃদ্ধ গ্যাস পৃথক করা সম্ভব হয়। ব্যাপন সূত্র অনুযায়ী, দুটি ভিন্ন আণবিক ভরের গ্যাসের ব্যাপন হারের অনুপাত মূলত √(M₂/M₁) অনুসারে নির্ধারিত হয়, যেখানে M₁ এবং M₂ হলো গ্যাসদ্বয়ের আণবিক ভর। সেক্ষেত্রে √(৩৫২/৩৪৯) = √(1.0086) ≈ 1.0043, অর্থাৎ ²³⁵UF₆ এর ব্যাপন হার ²³⁸UF₆ এর চেয়ে প্রায় ০.৪৩% বেশি। যদিও এই পার্থক্য অত্যন্ত সামান্য, তবে বহুবার পুনরাবৃত্তি করে এ প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট পরিমাণ ²³⁵U পৃথক করা সম্ভব হয়।
এই পদ্ধতিকে বলা হয় গ্যাস ব্যাপন (gaseous diffusion)। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওক রিজ (Oak Ridge) গবেষণাগারে ব্যবহৃত হতো। এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই ²³⁵U সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে ‘লিটল বয়’ নামক পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হয়, যা ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা শহরে নিক্ষেপ করা হয়। সেই বিস্ফোরণে এক ঝলকেই লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং পুরো শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়।
বর্তমানেও পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এই প্রযুক্তির আধুনিক সংস্করণ ব্যবহার করে থাকে। যদিও গ্যাস ব্যাপন পদ্ধতিটি এখন অনেকটা পুরনো প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এর পরিবর্তে অধিক কার্যকর ও কম জ্বালানি-নির্ভর পদ্ধতি যেমন গ্যাস সেন্ট্রিফিউজ (gas centrifuge) পদ্ধতি বেশি ব্যবহৃত হয়, তবুও গ্যাস ব্যাপন পদ্ধতি এখনও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য। বিশেষত, গবেষণাগার বা সামরিক প্রয়োজনে যেখানে অত্যন্ত বিশুদ্ধ ²³⁵U প্রয়োজন, সেখানে এটি এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখযোগ্য যে, UF₆ একটি অস্বাভাবিক গ্যাস, যা উচ্চ তাপমাত্রায় খুব সহজেই বাষ্পে পরিণত হয়। এর স্ফুটনাঙ্ক মাত্র ৩২৯ কেলভিন বা ৫৫.৮৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই কারণে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একে গ্যাসীয় অবস্থায় রাখা যায় এবং প্রযুক্তিগত সুবিধার জন্য এটি আদর্শ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। UF₆ গ্যাসটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আর্দ্রতার উপস্থিতিতে সহজেই ক্ষতিকর হাইড্রোফ্লুরিক অ্যাসিড (HF) তৈরি করতে পারে। ফলে এর সঙ্গে কাজ করার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।
পৃথকীকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত মেমব্রেনগুলোর গঠন অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং শক্তিশালী উপাদানে তৈরি হয়, যেন উচ্চচাপেও তা বিকৃত না হয় এবং গ্যাসের ক্ষুদ্র কণাগুলো সঠিকভাবে পৃথক হয়। হাজার হাজার মেমব্রেন ধারাবাহিকভাবে বসানো হয়, যাকে বলা হয় “ক্যাসকেড ইউনিট”। প্রতিটি ইউনিটে ইউরেনিয়াম সামান্য পরিমাণে গাঢ় হয় এবং ধাপে ধাপে অনেকগুলো ইউনিট অতিক্রম করার পর চূড়ান্তভাবে উচ্চ-গ্রেড ²³⁵U পাওয়া যায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল। তবে এর মাধ্যমে পাওয়া পারমাণবিক শক্তি অন্য যেকোনো জ্বালানি উৎসের তুলনায় বহু গুণ বেশি।
বর্তমান বিশ্বে নিউক্লিয়ার পাওয়ার স্টেশনগুলোতে ব্যবহৃত জ্বালানি মূলত ৩-৫% সমৃদ্ধ ²³⁵U ধারণ করে। এটিকে “লো এনরিচড ইউরেনিয়াম” (LEU) বলা হয়, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর। অপরদিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামকে “হাই এনরিচড ইউরেনিয়াম” (HEU) বলা হয়, যার ²³⁵U এর ঘনত্ব ৯০% এরও বেশি হয়ে থাকে। এই উচ্চমাত্রায় গাঢ়ীকৃত ইউরেনিয়াম অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের আওতাভুক্ত।
ইউরেনিয়ামের আইসোটোপ পৃথকীকরণের মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার মানবসভ্যতার অন্যতম বিপ্লবী আবিষ্কার হলেও এর সঠিক ও নৈতিক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেমন মানুষের কল্যাণে আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে, তেমনি অপব্যবহারে তা চরম বিপর্যয়ও ডেকে আনতে পারে। তাই পারমাণবিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতিমালা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক সচেতনতা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক।


Leave a Reply