নতুন কম্পিউটার, স্মার্টফোন কেনার সময় আমরা বারবার দেখি, সেটার প্রসেসর কতটা শক্তিশালী। প্রিয় গেম খেলার সময় অথবা গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজের সময় কম্পিউটারটা হ্যাং করবে কিনা, সেটার বড় কারণই এই প্রসেসর। কিন্তু কয়েক বছর পরপরই আমাদের নতুন মডেলের প্রসেসরযুক্ত কম্পিউটার, স্মার্টফোন কিনতে হয়।
কারণ এদের শক্তিমত্তা নির্দিষ্ট অথচ সফটওয়্যার গুলো ঠিকই জটিল আর বড় হচ্ছে। ফলে কম্পিউটার স্লো হয়, এ্যাপ কাজ করে না। কিন্তু এমন যদি কোনো প্রসেসর থাকতো, যেটায় চালিও কম্পিউটার কখনোই হ্যাং করবে না, তাহলে কেমন হতে? সম্ভব, এবং বর্তমানে এমন প্রযুক্তি বাস্তবেও রয়েছে। এগুলোকে বলা হয় কোয়ান্টাম কম্পিউটার। ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারে যেসব জটিল হিসাব করতে কয়েক বছর লেগে যায়, কোয়ান্টাম কম্পিউটার তা কয়েক ঘণ্টাতেই সম্পন্ন করতে পারে। এই প্রযুক্তির সর্বশেষ সংযোজন মাইক্রোসফটের মেজরানা-১ কোয়ান্টাম কম্পিউটিং চিপ, যেখানে “চিপ” বলতে প্রসেসরকে বোঝানো হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটিং আসলে কী? আমরা জানি, কম্পিউটার বাংলা বা ইংরেজি ভাষা বোঝে না; আমরা যে ভাষাতেই তথ্য দিই না কেন, তা শেষ পর্যন্ত ০ এবং ১ এই দুই সংখ্যায় রূপান্তরিত হয়।
কারণ কম্পিউটারের ভেতরে সব কাজই বিদ্যুতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ভোল্টেজ ২ থেকে ৫ হলে বিদ্যুৎ আছে, অর্থাৎ ১, আর ভোল্টেজ খুব কম বা ০ হলে বিদ্যুৎ নেই, অর্থাৎ ০। এই বাইনারি নিয়মেই তৈরি হয়েছে সব ক্লাসিক্যাল কম্পিউটার। মোবাইল, ল্যাপটপ, এমনকি সুপারকম্পিউটারও। এখানে তথ্যের ক্ষুদ্রতম একক হলো বিট, যা একসময় ০ অথবা ১ দুটো একসাথে নয়। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারে তথ্যের একক হলো কিউবিট, যা একইসাথে ০ এবং ১ উভয় অবস্থায় থাকতে পারে। এই ধারণা বোঝাতে একটি কয়েনের উদাহরণ ধরা যায়: টেবিলে স্থির কয়েন হলে তা হেড বা টেল। একটি মাত্র অবস্থা, কিন্তু ঘূর্ণায়মান কয়েন একইসাথে হেড ও টেল এই অবস্থাকে বলা হয় কোয়ান্টাম সুপারপজিশন।
কিউবিটও এমনই কাজ করে, ফলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার একসাথে বহু সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করতে পারে এবং দ্রুত ফলাফল দেয়। আমাদের চারপাশের জগৎ যদিও দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ও সময়। এই চার মাত্রায় সীমাবদ্ধ, কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী বাস্তবতা অসীম মাত্রার হতে পারে, যেখানে কিউবিটের আচরণ স্বাভাবিক। কোয়ান্টাম কম্পিউটার দ্রুত হওয়ার কারণ হলো এটি একইসাথে বহু পথ পরীক্ষা করতে পারে। যেখানে ক্লাসিক্যাল কম্পিউটার একেকটি পথ ধরে এগোয় এবং ভুল হলে ফিরে আসে, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার একসাথে বহু পথ অনুসন্ধান করে সমাধানে পৌঁছে যায়। তবে এত শক্তিশালী প্রযুক্তি সত্ত্বেও সব জায়গায় এটি ব্যবহৃত হয় না, কারণ এটি ব্যয়বহুল এবং বড় সমস্যা হলো কিউবিটের অস্থিরতা বা ডিকোহেরেন্স। সামান্য তাপ বা পরিবেশগত পরিবর্তনেই কিউবিটের অবস্থা বদলে যায়, ফলে তথ্য নষ্ট হতে পারে।
এই সমস্যা মোকাবেলায় অতিরিক্ত কিউবিট ব্যবহার করে ত্রুটি সংশোধন করতে হয়, যা বড় স্কেলে সিস্টেম তৈরি কঠিন করে তোলে। এই চ্যালেঞ্জ সমাধানে এসেছে মেজরানা ১ চিপ, যেখানে ব্যবহৃত হয়েছে টপোলজিক্যাল কিউবিট, যা পরিবেশের প্রভাব থেকে অনেক বেশি সুরক্ষিত। এই কিউবিটের কেন্দ্রে থাকে মেজোরানা ফার্মিয়ন। এক ধরনের কণা, যা নিজেই নিজের প্রতিকণা; ১৯৩৭ সালে ইতালীয় পদার্থবিদ এত্তোরে মাজোরানা এর ধারণা দেন। আধুনিক গবেষণায় ন্যানোওয়ারের মাধ্যমে এই কণার মতো অবস্থা তৈরি করা হয়, যেখানে ইন্ডিয়াম আর্সেনাইডের মতো সেমিকন্ডাক্টর তারের ওপর অ্যালুমিনিয়ামের সুপারকন্ডাক্টিং স্তর বসানো হয় এবং অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রা ও চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করে টপোলজিক্যাল সুপারকন্ডাক্টিং অবস্থা তৈরি করা হয়।
এই অবস্থায় ন্যানোওয়ারের দুই প্রান্তে মেজোরানা ধরনের ছদ্মকণিকা সৃষ্টি হয়, যা তথ্যকে টপোলজিক্যাল সুরক্ষায় রাখে। কোয়ান্টাম গণনা এখানে “ব্রেইডিং” নামে একটি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়, যেখানে এই কণাগুলোকে নির্দিষ্ট ক্রমে ঘোরানো হয়; ক্রম পরিবর্তিত হলে ফলাফলও বদলে যায়, অনেকটা দড়ির গিঁট বাঁধার মতো। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আণবিক স্তরে প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব, বিলিয়ন কণার আচরণ গণনা করা যায়, নতুন ওষুধ ও শক্তিশালী উপাদান আবিষ্কার করা সহজ হয়। যদিও কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখনো পুরোপুরি সাধারণ ব্যবহারে আসেনি, তবুও মাইক্রোসফট, গুগল, আমাজন, ইন্টেলসহ বহু প্রতিষ্ঠান এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে; কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে মানবসভ্যতা এক নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব আগামী প্রজন্মের হাতে।