বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল এবং এতে প্রায় ১৭ হাজার কোটি কোষ থাকে, কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো এই বিশাল কাঠামোর সূচনা হয় মাত্র একটি একক কোষ থেকে। মাতৃগর্ভে সেই একটি কোষ বিভাজিত হতে হতে কীভাবে এত নিখুঁতভাবে কোটি কোটি কোষের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক তৈরি করে, সেটিই দীর্ঘদিনের এক রহস্য। কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরির একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী সম্প্রতি এই প্রশ্নের একটি চমকপ্রদ ও তুলনামূলক সহজ ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা শুধু জীববিজ্ঞান নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
অধ্যাপক অ্যান্থনি জাদরের ল্যাবের পোস্টডক্টরাল গবেষক স্ট্যান কার্স্টজেন্স ব্যাখ্যা করেন যে একটি কোষ মূলত নিজের অবস্থানগত তথ্যের ভিত্তিতেই তার ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্ধারণ করে, অর্থাৎ একটি কোষ কোথায় আছে সেটিই ঠিক করে দেয় সেটি কী হবে। তিনি বলেন, একটি কোষ কেবল নিজেকে এবং আশপাশের কোষকে দেখতে পায়, তাই বড় হওয়ার সময় প্রতিটি কোষকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতে হয়। আমি কোথায় আছি এবং আমাকে কী হতে হবে। যদি কোনো কোষ ভুল জায়গায় চলে যায়, তবে সেটি ভুল ধরনের কোষে পরিণত হয় এবং মস্তিষ্কের গঠন ব্যাহত হতে পারে। বহুদিন ধরে ধারণা ছিল কোষগুলো রাসায়নিক সংকেত আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পায়, কিন্তু সমস্যা হলো দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংকেত দুর্বল হয়ে যায়, ফলে গভীর বা দূরের কোষগুলোর জন্য নিখুঁত অবস্থান নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সীমাবদ্ধতার সমাধান হিসেবে কার্স্টজেন্স ও তাঁর সহকর্মীরা হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এবং ইটিএইচ জুরিখের গবেষকদের সঙ্গে মিলে একটি নতুন ধারণা দেন, যেখানে বলা হয় কোষের বংশানুক্রমিক সম্পর্কই তাদের অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ যেসব কোষ একই পূর্বসূরি কোষ থেকে জন্ম নেয়, তারা সাধারণত কাছাকাছি অবস্থানে থাকে, ঠিক যেমন মানুষ তাদের পূর্বপুরুষদের আশেপাশে বসতি গড়ে তোলে, এতে কোনো জটিল দূরপাল্লার যোগাযোগের প্রয়োজন হয় না, বরং স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় কাঠামো তৈরি হয়ে যায়। এই গবেষণায় দেখা গেছে যে শুধুমাত্র রাসায়নিক সংকেত নয়, বরং বংশগত সম্পর্ক এবং রাসায়নিক সংকেত একসঙ্গে কাজ করে কোষগুলোকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেয়। এই ধারণা যাচাই করতে গবেষকেরা প্রথমে গাণিতিক মডেল তৈরি করেন, এরপর ইঁদুরের মস্তিষ্কে বিভিন্ন কোষের জিন এক্সপ্রেশন বিশ্লেষণ করেন এবং সবশেষে জেব্রাফিশের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেন যে এই প্রক্রিয়াটি বিভিন্ন আকারের মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও একইভাবে কাজ করে।
এই আবিষ্কার শুধু মস্তিষ্কের বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, ক্যানসার টিউমারের বৃদ্ধি বোঝা এবং ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বংশবৃদ্ধিকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কার্স্টজেন্সের ভাষায়, মস্তিষ্ক আমাদের বুদ্ধিমান করে তোলে, কিন্তু এই ক্ষমতা কীভাবে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে তা এখনও এক বিশাল রহস্য, আর তাঁদের এই গবেষণা সেই রহস্যের পাজলের একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সূত্রঃ scitechdaily.com