চুলায় পানি গরম করলে আমরা সাধারণত প্রথমে ছোট ছোট বুদবুদ উঠতে দেখি। এটাই ইঙ্গিত দেয় যে পানি ফুটতে চলেছে। কিন্তু মাইক্রোওয়েভে পানি গরম করলে সেই বুদবুদগুলো দেখা যায় না। কেন এমন হয়?
চুলায় পানি গরম করার সময় তলার দিক থেকে উত্তাপ বাড়তে থাকে, এবং ছোট ছোট বুদবুদ তৈরি হয়। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে বুদবুদগুলো বড় হয় এবং শেষে প্রচণ্ড ফুটতে শুরু করলে তা বোঝায় যে পানি ১০০° সেলসিয়াস (২১২° ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় পৌঁছেছে।
কিন্তু সত্যি কি তাই? মাইক্রোওয়েভে পানি ফুটানোর সময় তো কোনো বুদবুদই দেখা যায় না! তাহলে মাইক্রোওয়েভ ছাড়া ফুটন্ত পানিতে বুদবুদ কেন দেখা যায়?
বুদবুদ তৈরি হওয়ার বিজ্ঞান
পানিকে কোনো উত্তপ্ত পৃষ্ঠের ওপর গরম করলে ন্যানো-স্কেলে ক্রমাগত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বুদবুদ তৈরি হয়ে ভেঙে যায়। তবে বড় বুদবুদ তৈরি হতে (যা আমরা দেখতে পাই) পানির তাপমাত্রা কখনও কখনও তাত্ত্বিক স্ফুটনাঙ্কের (১০০° সেলসিয়াস) চেয়েও বেশি হতে হয়। ফুটন্ত বিন্দুর উপরে তাপমাত্রায় পানির অণুগুলো তরল থাকার চেয়ে বাষ্প হতে বেশি পছন্দ করে। অর্থাৎ ১০০° সেলসিয়াসের উপরে গ্যাস (বাষ্প) আকারে থাকা বেশি স্থিতিশীল। কিন্তু ফুটতে হলে শুধু বাষ্প হওয়া যথেষ্ট নয় বুদবুদও তৈরি হতে হবে, আর বুদবুদ তৈরি করতে অতিরিক্ত শক্তি লাগে।
বুদবুদ তৈরি হতে কেন অতিরিক্ত শক্তি লাগে?
বুদবুদ হলো গ্যাস-তরল দুই স্তরের মাঝের একটি আলাদা সীমানা। এই সীমানায় “সারফেস টেনশন” বা পৃষ্ঠ-টান কাজ করে, যা বুদবুদকে সংকুচিত করে আবার তরলে মিশে যেতে চায়। অতএব, বুদবুদ টিকে থাকতে হলে তার ভেতরে যথেষ্ট বাষ্প জমা থাকতে হবে যাতে পৃষ্ঠ-টানের শক্তিকে পরাজিত করা যায়। ছোট বুদবুদের ক্ষেত্রে পৃষ্ঠ-টান বেশি প্রভাব ফেলে, বড় বুদবুদ বেশি স্থিতিশীল। তাই পানি অনেক সময় ১০০° সেলসিয়াসে না ফুটে সামান্য বেশি তাপমাত্রায় গিয়ে ফুটতে শুরু করে এটাকেই সুপারহিটিং বলে।
কী কী জিনিস বুদবুদ তৈরি সহজ করে?
পানিতে দ্রবীভূত গ্যাস, পানির অপবিত্রতা, পাত্রের পৃষ্ঠ সবকিছুই বুদবুদ তৈরিকে সহজ করে। কারণ এগুলো “নিউক্লিয়েশন পয়েন্ট” হিসেবে কাজ করে, যেখানে বুদবুদ সহজে তৈরি হয়। এজন্যই চুলার হাঁড়ির কিনারায় প্রথম বুদবুদ দেখা যায়। আবার পৃষ্ঠটান বলের কারণে পানির বুঁদবুদ বা ফোঁটা গোলাকৃতির হয়।
আরো পড়ুন
মাইক্রোওয়েভে পানি ফুটলে বুদবুদ দেখা যায় না কেন?
মাইক্রোওয়েভে পানি গরম হওয়ার পদ্ধতি আলাদা। মাইক্রোওয়েভ পুরো পানির ভলিউম জুড়ে পানির অণুকে একসাথে উত্তেজিত করে, ফলে পানি খুব দ্রুত ও সমানভাবে গরম হয়। চুলার মতো নিচের দিকেই বেশি গরম হয় না। এর পাশাপাশি মাইক্রোওয়েভে আমরা সাধারণত, মসৃণ পাত্রে (যেমন কাঁচ) পানি গরম করি। যেখানে কোনো খসখসে অংশ থাকে না, ফলে বুদবুদ তৈরি শুরু করার মতো জায়গাও থাকে না। ফলে পানি অস্বাভাবিকভাবে বেশি তাপমাত্রা পর্যন্ত সুপারহিট হতে পারে, প্রায় ২০° সেলসিয়াস (৩৬° ফারেনহাইট) বেশি পর্যন্ত! এই অতিরিক্ত জমে থাকা শক্তি এক মুহূর্তে বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে যায় যখন,
পাত্র নড়ানো হয়
চামচ ঢোকানো হয়
কোনো কিছু ফেলা হয় পানির মধ্যে।
তখন হঠাৎ করে বিশাল বুদবুদ তৈরি হয়ে পানি ছিটকে পড়তে পারে, এ কারণে মাইক্রোওয়েভে পানি গরম করা বিপজ্জনক হতে পারে। পানি ছাড়াও অন্য তরলও সুপারহিট হতে পারে। গ্যালোর মতে, শুধু পানি নয়, যেকোনো তরলই সুপারহিট হতে পারে। তবে পানির পৃষ্ঠ-টান বেশ বেশি হওয়ায় এর ক্ষেত্রে এই প্রভাব বেশি নাটকীয়ভাবে দেখা যায়।


Leave a Reply