বোরো ধান উচ্চ তাপমাত্রা হতে রক্ষার উপায়

বোরো ধান উচ্চ তাপমাত্রা হতে রক্ষার উপায়

Hossain Hawlader
লেখকঃ Hossain Hawlader
4 মিনিট পড়তে লাগবে

উচ্চ তাপমাত্রা থেকে বোরো ধান রক্ষায় করণীয়বৃষ্টিহীন প্রকৃতি আর তীব্র দাবদাহ মিলিয়ে যেন অদৃশ্য এক আগুনের চাদর ঢেকে দিচ্ছে মাঠঘাট। এই নীরব ঘাতক ‘হিট শক’-এর ভয়ে কৃষকের চোখেমুখে স্পষ্ট উদ্বেগ। কিন্তু প্রশ্ন একটাই এ বিপদ থেকে বোরো ধানকে রক্ষা করার উপায় কি নেই? সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ এবং সময়মতো পরিচর্যার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশের কৃষি বরাবরই প্রকৃতিনির্ভর। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও তীব্র শীতের সঙ্গে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে যুক্ত হয়েছে তাপপ্রবাহ বা হিট শক। দীর্ঘদিন বৃষ্টিহীন অবস্থায় উচ্চ তাপমাত্রাই মূলত এই সমস্যার সৃষ্টি করে। ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল হাওরাঞ্চলে তীব্র দাবদাহে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল, যার প্রভাব পড়ে দেশের ৩৬টি জেলায়। শুধু বোরো ধানেই ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২৮ কোটি টাকা।

ধানগাছের জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব ভিন্নভাবে দেখা যায়। অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়ে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে পাতার অগ্রভাগ সাদা হয়ে যায়, পাতায় দাগ পড়ে এবং গাছের উচ্চতা ও কুশির সংখ্যা কমে যায়। যদিও এই পর্যায়ে ফলনের ওপর প্রভাব তুলনামূলক কম, কিন্তু প্রজনন পর্যায়ে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালেই বিপদ বাড়ে। শীষ বের হওয়ার আগে ও ফুল ফোটার সময় সামান্য সময়ের জন্যও বেশি তাপমাত্রা থাকলে সাদা শীষ, চিটা দানা এবং ফলনহানি দেখা দেয়।

পরিপক্ব পর্যায়ে অতিরিক্ত তাপ দানা গঠন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে অর্ধপুষ্ট দানার সংখ্যা বেড়ে যায়। এই সময় গাছ নিজেকে ঠান্ডা রাখতে প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় পানি ছাড়ে, যা অনেকটা প্রাকৃতিক কুলিং সিস্টেমের মতো কাজ করে। কিন্তু বৃষ্টিহীন দাবদাহে এই পানি দ্রুত হারিয়ে গেলে শীষ ও ডিগপাতা শুকিয়ে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ধানের শীষ ও পাতার তাপমাত্রা বাতাসের তুলনায় ৪–৬ ডিগ্রি কম রাখতে হয়। তাই তীব্র গরমে গাছকে বাঁচাতে জমিতে পর্যাপ্ত পানি থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ফুল ফোটা থেকে দানা শক্ত হওয়া পর্যন্ত জমিতে ২–৩ ইঞ্চি পানি ধরে রাখা বাধ্যতামূলক।

তাপপ্রবাহের সময় রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। ঝড়ের পরে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতাপোড়া রোগ দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ এমওপি, থিওভিট ও দস্তা সার পানিতে মিশিয়ে বিকেলে স্প্রে করলে উপকার পাওয়া যায়। আবার থোড় অবস্থায় অতিরিক্ত পটাশ সার প্রয়োগ গাছকে শক্তিশালী করে। নেক ব্লাস্ট বা শীষ ব্লাস্ট রোগ এই সময় সবচেয়ে ভয়ংকর। একবার আক্রান্ত হলে দমন প্রায় অসম্ভব। তাই প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। শীষ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একবার এবং ৫–৭ দিন পর আবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। একই সঙ্গে বাদামি গাছফড়িংয়ের আক্রমণ ঠেকাতে অনুমোদিত কীটনাশক গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করা উচিত।

সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো সময়মতো রোপণ। এমনভাবে বপন করতে হবে যাতে ফুল ফোটার সময় তীব্র দাবদাহের সঙ্গে না মিলে যায়। পাশাপাশি উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনেও কাজ করছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। ইতোমধ্যে ‘এন২২’ ও ‘ব্রি ধান ২৮’-এর সংকরায়ণে একটি নতুন লাইন তৈরি হয়েছে, যা উচ্চ তাপমাত্রায়ও ভালো ফলন দিতে সক্ষম বলে আশা করা হচ্ছে।প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ে জিততে হলে কৌশলই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সঠিক সময়, সঠিক পরিচর্যা আর সচেতন ব্যবস্থাপনাই পারে হিট শকের আগুনে পুড়ে যাওয়া স্বপ্নগুলোকে আবার সবুজ করে তুলতে।

সূত্র: বিজ্ঞানচিন্তা.কম

শেয়ার করুন
লেখকঃHossain Hawlader
অনুসরণ করুন
আমি হোসাইন হাওলাদার। আমি mehrab360.com এ একজন সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। আমি সরকারি ব্রজলাল কলেজ, খুলনা এর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ইমেইল: [email protected]
মন্তব্য করুন