
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্সে কেউ পানীয় জলের ট্যাপ খুললেই দেখা যাচ্ছে লোনা পানি। আবার বাংলাদেশে কৃষকেরা তাঁদের উর্বর জমি ছেড়ে চিংড়ি চাষের লোনা জলাশয়ে পরিণত করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর গাম্বিয়ায় একজন কৃষক অসহায়ভাবে দেখছেন তাঁর ফসল লোনাপানিতে ভিজে শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এক সময়ের নির্ভরযোগ্য উপকূলীয় সুপেয় জলের উৎস এখন লোনা হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের মিঠা পানির স্তরে মিশে যাওয়ার এই ধীরগতির কিন্তু ভয়াবহ সংকটকে বলা হয় লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ। অ্যান্টার্কটিকা বাদে বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশের উপকূলীয় এলাকার অন্তত ১ কিলোমিটার অভ্যন্তরে ২০৫০ সালের মধ্যে লোনাপানি ঢুকে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমেরিকার ওয়েস্টার্ন ক্যারোলিনা ইউনিভার্সিটির উপকূলীয় ভূতত্ত্বের অধ্যাপক রবার্ট ইয়ং বলেন, ‘লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ধীরগতির জলবায়ুসংকটের একটি আদর্শ উদাহরণ। আমরা প্রায়ই ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের মতো বড় দুর্যোগ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু এই ধীর পরিবর্তনগুলো এড়িয়ে যাই। আমরা ভুল দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে রোড আইল্যান্ড পর্যন্ত এই সংকট ছড়িয়ে পড়েছে। লুইজিয়ানার বাসিন্দারা তাদের ট্যাপের পানিতে লোনা স্বাদ পাচ্ছেন। লোনাপানি পান করা কেবল অস্বস্তিকরই নয়, এটি উচ্চ রক্তচাপ এবং গর্ভাবস্থায় জটিলতাসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়্যারের উপকূলীয় হাইড্রোজোলজিস্ট হলি মাইকেল জানান, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৃষ্টি কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে মিঠা ও লোনাপানির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা লোনাপানিকে স্থলভাগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গাম্বিয়া, ভিয়েতনাম এবং বাংলাদেশের মতো নিচু অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকেরা। গাম্বিয়ার ৫৯ বছর বয়সী কৃষক নার্স সেনেহ ১৯৮৭ সাল থেকে ধান চাষ করছেন। কয়েক প্রজন্ম ধরে তাঁদের পরিবার এই জমিতে বাম্পার ফলন পেয়েছেন। কিন্তু চার বছর আগে আটলান্টিক মহাসাগরের লোনাপানি তাঁর আড়াই একর জমিতে ঢুকে পড়ে। সেনেহ বলেন, ‘আমাকে ধানখেত ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে। এখন সেই পুরো এলাকা অনাবাদি পড়ে আছে। গাম্বিয়ার ধান চাষের প্রধান উৎস গাম্বিয়া নদী এখন সমুদ্রপৃষ্ঠের সমতলে চলে এসেছে, ফলে লোনাপানি নদীর ২৫০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত ঢুকে পড়ছে। একই চিত্র দেখা যায় বাংলাদেশেও। খুলনার নারীরা মাইলের পর মাইল হেঁটে মিঠা পানি সংগ্রহ করছেন। অনেক কৃষক ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি চাষে ঝুঁকছেন, যা মাটির লবণাক্ততা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সামাজিক দ্বন্দ্ব তৈরি করছে।’এই লোনাপানির আগ্রাসন রুখতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রকৌশলগত সমাধান খোঁজা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনামে জোয়ারের সময় লোনাপানি আটকাতে এবং ভাটার সময় পানি বের করে দিতে বিশাল স্লুইসগেট বা টাইড গেট নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ফ্লোরিডা, চীন ও নেদারল্যান্ডসে শোধিত বর্জ্য জল বা বৃষ্টির জল মাটির নিচে পাম্প করে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে মিঠা পানির স্তর বেড়ে লোনাপানিকে ঠেলে দেয়। ভিয়েতনামের ট্রা ভিন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে পানির লবণাক্ততা পরিমাপের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। আবার মেকং ডেল্টায় লোনা মাটিতে জন্মানো হোগলাজাতীয় উদ্ভিদের চাষ করা হচ্ছে, যা দিয়ে ঝুড়ি বুনে বিকল্প আয়ের পথ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির জলবায়ু গবেষক লিজি ইয়ারিনা বলেন, এই সমস্যার কোনো জাদুকরি সমাধান নেই। এক জায়গায় যা কাজ করে, অন্য জায়গায় তা না–ও করতে পারে। ২০২৪ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৭৭ শতাংশ উপকূল লবণাক্ততার শিকার হবে। গাম্বিয়ার অধ্যাপক সিদাত ইয়াফা সতর্ক করে বলেন, ধান উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশটিতে চরম খাদ্যসংকট এবং দাঙ্গা দেখা দিতে পারে। কৃষক সেনেহ এখন ধানের বদলে সবজি চাষ করছেন, কিন্তু তাতে পরিবারের অন্ন জুটছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি কোনো দিন ভাবিনি, আমাকে চাল কিনে খেতে হবে। লোনাপানি আমাদের জীবনকে অসহনীয় করে তুলছে।
সূত্র: বিবিসি, প্রথম আলো

