মানুষ বেশি কেন ডানহাতি? নতুন গবেষণায় মিলল চমকপ্রদ রহস্য

মানুষ বেশি কেন ডানহাতি? নতুন গবেষণায় মিলল চমকপ্রদ রহস্য

Hossain Hawlader
লেখকঃ Hossain Hawlader
4 মিনিট পড়তে লাগবে

মানব বিবর্তনের অন্যতম অদ্ভুত ধাঁধাগুলোর একটি হলো, কেন অধিকাংশ মানুষ ডানহাতি। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানব সংস্কৃতিতে দেখা যায়, প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ডান হাত ব্যবহারে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। অথচ অন্য কোনো প্রাইমেট প্রজাতির মধ্যে জনসংখ্যা স্তরে এমন প্রবল একমুখী প্রবণতা দেখা যায় না। হাত ব্যবহারের পেছনে মস্তিষ্ক, জিন এবং বিকাশগত প্রভাব নিয়ে কয়েক দশক ধরে গবেষণা চললেও, মানুষ কেন এত ব্যাপকভাবে ডানহাতি হয়ে উঠল, তা এখনো এক বিবর্তনীয় রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে।

নতুন এক গবেষণায় হাত, মস্তিষ্ক এবং হাঁটার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং পিএলওএস বায়োলজিতে প্রকাশিত এই গবেষণা বলছে, এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানব বিবর্তনের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্যে। দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটা এবং মানব মস্তিষ্কের নাটকীয় সম্প্রসারণে। অক্সফোর্ডের স্কুল অব অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড মিউজিয়াম এথনোগ্রাফির ডঃ টমাস এ. পুশেল ও র‍্যাচেল এম. হারউইটজ এবং ইউনিভার্সিটি অফ রিডিং-এর অধ্যাপক ক্রিস ভেন্ডিটির গবেষণায় বানর ও বনমানুষের ৪১টি প্রজাতির মোট ২,০২৫টি প্রাণীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষকেরা বেসিয়ান মডেলিং ব্যবহার করে বিভিন্ন বিবর্তনীয় অনুমান পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে ছিল সরঞ্জাম ব্যবহার, খাদ্যাভ্যাস, বাসস্থান, দেহের ভর, সামাজিক সংগঠন, মস্তিষ্কের আকার এবং চলাচলের ধরন। প্রথমে দেখা যায়, অন্যান্য সব প্রাইমেটের তুলনায় মানুষ একটি স্পষ্ট ব্যতিক্রম। কিন্তু গবেষকেরা যখন বিশ্লেষণে দুটি অতিরিক্ত উপাদান যুক্ত করেন, অর্থাৎ মস্তিষ্কের আকার এবং হাত ও পায়ের আপেক্ষিক দৈর্ঘ্য, যা দ্বিপদ চলনের গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় চিহ্ন, তখন সেই ব্যতিক্রমী অবস্থান আর থাকে না। অর্থাৎ, সোজা হয়ে হাঁটা এবং বড় মস্তিষ্কের প্রভাব বিবেচনায় আনলে মানুষকে আর বিবর্তনের বিচ্ছিন্ন উদাহরণ বলে মনে হয় না। একই মডেলের সাহায্যে গবেষকেরা বিলুপ্ত মানব পূর্বপুরুষদের ডানহাতি বা বাঁহাতি হওয়ার সম্ভাবনাও অনুমান করেন।

ফলাফলে একটি ধীরে ধীরে পরিবর্তনের চিত্র ফুটে ওঠে। আর্ডিপিথেকাস এবং অস্ট্রালোপিথেকাসের মতো আদিম হোমিনিনদের মধ্যে সামান্য ডানহাতি প্রবণতা ছিল, যা আধুনিক গ্রেট এপদের সঙ্গে অনেকটাই মিল রাখে। পরে হোমো এরগাস্টার, হোমো ইরেক্টাস এবং নিয়ান্ডারথালের সময়ে এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয় এবং শেষ পর্যন্ত হোমো সেপিয়েন্সে এসে আধুনিক চরম অবস্থায় পৌঁছে যায়। তবে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রমও রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কবিশিষ্ট তথাকথিত ‘হবিট’ প্রজাতি হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিসের ক্ষেত্রে ডানহাতি হওয়ার পূর্বাভাস তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল।

গবেষকদের মতে, এটি বৃহত্তর প্রবণতার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, তাদের মস্তিষ্ক ছিল ছোট এবং শরীর এমনভাবে অভিযোজিত ছিল, যেখানে সোজা হয়ে হাঁটার পাশাপাশি গাছে চড়ার বৈশিষ্ট্যও বজায় ছিল। গবেষণার ফলাফল একটি দ্বি-পর্যায়ের বিবর্তনীয় ঘটনার ইঙ্গিত দেয়। প্রথম ধাপে মানুষ সোজা হয়ে হাঁটা শুরু করে, ফলে চলাচলের কাজ থেকে হাত মুক্ত হয়ে যায় এবং সূক্ষ্ম ও জটিল হাতের ব্যবহার বিকাশের জন্য নতুন নির্বাচনী চাপ তৈরি হয়। দ্বিতীয় ধাপে মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পায়। মস্তিষ্ক যত বড় ও পুনর্গঠিত হতে থাকে, ডানহাতি হওয়ার প্রবণতাও তত দৃঢ় হয়ে আজকের প্রায় সর্বজনীন বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞানের ওয়েন্ডি জেমস সহযোগী অধ্যাপক ডঃ টমাস এ. পুশেল বলেন, “একই কাঠামোর মধ্যে মানুষের বাঁহাতি হওয়ার প্রবণতা সম্পর্কিত একাধিক প্রধান অনুমান পরীক্ষা করার জন্য এটিই প্রথম গবেষণা। ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, মানুষের ডানহাতি হওয়ার প্রবণতা সম্ভবত এমন কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা আমাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে, বিশেষ করে সোজা হয়ে হাঁটা এবং বড় মস্তিষ্কের বিবর্তন।” এই গবেষণা ভবিষ্যতের জন্য আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উন্মুক্ত করেছে। যেমন, মানব সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান বিকাশ কি ডানহাতি হওয়ার প্রবণতাকে আরও স্থিতিশীল করেছে, বাঁহাতি হওয়ার প্রবণতা এখনো কেন টিকে আছে, এবং টিয়া পাখি বা ক্যাঙ্গারুর মতো প্রাণীদের মধ্যেও দেখা অঙ্গ ব্যবহারের পছন্দ কি বৃহত্তর প্রাণীজগতের কোনো গভীর ও অভিন্ন বিবর্তনীয় ধারার ইঙ্গিত বহন করে কিনা।

সূত্রঃ phys.org

শেয়ার করুন
লেখকঃHossain Hawlader
অনুসরণ করুন
আমি হোসাইন হাওলাদার। আমি mehrab360.com এ একজন সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। আমি সরকারি ব্রজলাল কলেজ, খুলনা এর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ইমেইল: [email protected]
মন্তব্য করুন