
প্রতিবছর প্রকৃতির এক নীরব বিস্ময় আকাশে আঁকে হাজার মাইল দীর্ঘ কমলা-কালো এক চলমান কবিতা। উত্তর আমেরিকার শীত নামার আগে, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে লক্ষ লক্ষ মোনার্ক প্রজাপতি উড়ে যায় মেক্সিকোর পর্বতমালার দিকে। তাদের এই যাত্রা শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং প্রকৃতির সূক্ষ্ম ভারসাম্যের এক অনন্য উদাহরণ। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা সতর্ক করছে, জলবায়ু পরিবর্তন এই ঐতিহাসিক অভিবাসনকে স্থায়ীভাবে ব্যাহত করতে পারে।
প্রজাপতি এর জন্য হুমকি
মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন শুধু পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতিদের নয়, বরং তাদের ডিম এবং লার্ভা পর্যায়েও মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। মোনার্ক প্রজাপতির জীবনের প্রাথমিক ধাপ অত্যন্ত সংবেদনশীল। ডিম ফুটে ক্যাটারপিলারে পরিণত হওয়া এবং তাদের বৃদ্ধি নির্ভর করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং উপযুক্ত উদ্ভিদের ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই সূক্ষ্ম পরিবেশগত শর্তগুলো দ্রুত বদলে যাচ্ছে, যা তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দিচ্ছে।
প্রতি শরৎকালে মোনার্কদের একটি বিশেষ প্রজন্ম দক্ষিণে যাত্রা করে এবং মোনার্ক বাটারফ্লাই বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভসহ মেক্সিকোর সংরক্ষিত বনাঞ্চলে শীতকাল কাটায়। বসন্ত এলেই তারা আবার উত্তরের দিকে ফিরে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেক্সিকোতে পৌঁছানো প্রজাপতির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। বন উজাড়, পরজীবী সংক্রমণ এবং অনিয়মিত আবহাওয়া এই পতনের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আরো পড়ুন: গরম লেবুর পানি কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো?
মোনার্ক প্রজাপতির বংশবৃদ্ধির জন্য মিল্কউইড উদ্ভিদ অপরিহার্য। স্ত্রী প্রজাপতি শুধুমাত্র এই গাছের পাতার নিচে ডিম পাড়ে, এবং ক্যাটারপিলাররা এই পাতাই খেয়ে বেড়ে ওঠে। এই উদ্ভিদ থেকে তারা এমন রাসায়নিক গ্রহণ করে, যা তাদের শিকারিদের কাছে অরুচিকর করে তোলে। গবেষণায় মেক্সিকোর অভিবাসনপথে জন্মানো ৪৬ প্রজাতির মিল্কউইড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০৩০ থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে প্রজাপতিদের উপযোগী প্রজননক্ষেত্র ক্রমশ দক্ষিণ দিকে সরে যাবে।
এই পরিবর্তনের ফলে বিবর্তনের ধারায় তাদের শারীরিক গঠনেও পরিবর্তন আসতে পারে। দীর্ঘ দূরত্ব উড়ার প্রয়োজন না থাকলে তাদের ডানা ছোট হয়ে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে দীর্ঘ উড্ডয়ন ক্ষমতা কমিয়ে দেবে। একসময় যে অভিবাসন কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোকে এক অদৃশ্য প্রাকৃতিক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল, তা হয়তো কেবল স্মৃতিতে রয়ে যাবে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, শতাব্দীর শেষ নাগাদ এই বিশ্বখ্যাত অভিবাসন হয়তো নতুন পথে রূপ নেবে অথবা পুরোপুরি থেমে যাবে। তখন এই বিস্ময়কর দৃশ্য কেবল বইয়ের পাতা বা ছবির অ্যালবামেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করতে উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত বন সংরক্ষণ ও পরিবেশগত উদ্যোগ নেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে PLOS Climate সাময়িকীতে।
সূত্র: earth.com

