তেহরানে আকাশ ছেয়ে গেল এক অদ্ভুত, গা ছমছমে অন্ধকারে। তারিখ ছিল ৮ মার্চ ২০২৬। আকাশ থেকে বৃষ্টি নামতেই স্থানীয় বাসিন্দারা বুঝলেন, এটি কোনো সাধারণ বৃষ্টি নয়; এই বৃষ্টি ছিল তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত, ঘন এবং কালচে রঙের। রাস্তাঘাট, বাড়ির ছাদ ও গাড়ি যেন কালো কালিতে ঢেকে গেল। অনেকেই একে ‘কালো বৃষ্টি’ বলে বর্ণনা করেন। আসলে সেই রাতেই ইসরায়েল ইরানের ৩০টির বেশি তেল স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালায়।
এই হামলা ও পরবর্তী অগ্নিকাণ্ড এতটাই তীব্র ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও পরে এর কৌশলগত যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বোমা ও বারুদের শব্দে আমরা প্রায়ই শুধু মানুষের মৃত্যুর হিসাব করি। কিন্তু এই যুদ্ধের আরেকটি নীরব শিকার আছে, যার কান্না শোনা যায় না, তা হলো প্রকৃতি। বিষাক্ত ধোঁয়া, সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়া তেল, ভয়ংকর কার্বন নির্গমন, দূষিত মাটি এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইকোসিস্টেম মিলিয়ে পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞ পুরো অঞ্চলে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। যুদ্ধ থেমে যাওয়ার বহুদিন পরও এই ক্ষতি প্রকৃতিকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করবে।
ওপেন সোর্স তথ্য, স্যাটেলাইট ছবি, সোশ্যাল মিডিয়ার ফুটেজ ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি মিলিয়ে ইরান, উপসাগরীয় অঞ্চল ও লেবাননে এক গভীর পরিবেশগত সংকটের চিত্র ফুটে উঠছে। আকাশ, সমুদ্র ও ভূমি; প্রকৃতির তিন রণাঙ্গনেই চলছে বহুমাত্রিক আক্রমণ। বাতাসে বিষের ঘনঘটা ভয়ংকর মাত্রা ছুঁয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই ৫০ লাখ টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড সমপরিমাণ গ্যাস বাতাসে ছড়িয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, প্রতিটি মিসাইল হামলায় প্রায় ০.১৪ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্যাস নির্গত হয়। যা একটি গাড়ি দিয়ে প্রায় ৩৫০ মাইল পথ অতিক্রমের সমান। শুধু হামলার প্রভাব নয়, মিসাইল উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, সামরিক বিমান ও নৌবাহিনীর কার্যক্রম, জ্বালানি পোড়ানো এবং পুনর্নির্মাণ কাজ মিলিয়েও বিপুল কার্বন নির্গমন ঘটে।
তেহরানে এই ধ্বংসযজ্ঞ সবচেয়ে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তেল স্থাপনায় হামলার পর কয়েক দিন ধরে শহরের আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে থাকে। বহু মানুষ এই দৃশ্যকে ‘কিয়ামতের মতো’ বলে বর্ণনা করেন। জ্বলন্ত তেল থেকে নির্গত ব্ল্যাক কার্বন তীব্র শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে। পাশাপাশি ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড, সালফার অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও অতিসূক্ষ্ম কণা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।সামরিক হামলার ফলে জ্বালানি তেল, ভারী ধাতু এবং পিএফএএসের মতো চিরস্থায়ী রাসায়নিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা সহজে বিলীন হয় না। লেবাননে সাদা ফসফরাস ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এটি আগুন ধরানো, ফসল ধ্বংস করা, মাটির গঠন বদলে দেওয়া এবং বিষাক্ত কণা ছড়ানোর মতো বিপজ্জনক কাজ করে। একটি যুদ্ধবিমান প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করতে পারে। কয়েক সপ্তাহে হাজার হাজার বিমান হামলা মিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে মিশেছে বলে ধারণা করা হয়।
মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা ক্ষতি আরও জটিল। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন চোখে দেখা গেলেও মাটি, পানি ও ধ্বংসস্তূপে জমে থাকা বিষাক্ত দূষণ শনাক্ত করা কঠিন। লেবাননে মাত্র ৪৫ দিনের যুদ্ধে ৫০ হাজারের বেশি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে হাজার হাজার পুরোপুরি ধ্বংস। ইরানেও হাজার হাজার ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এই ধ্বংসস্তূপ নিরীহ নয়। ভেঙে যাওয়া ভবন থেকে প্লাস্টিক, সলভেন্ট, ইনসুলেশন ফাইবার, অ্যাসবেস্টস ও ভারী ধাতু মাটি ও পানিতে মিশে যায়। এসব উপাদান খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে উদ্ভিদ, প্রাণী এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরে পৌঁছে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। লেবাননের প্রায় ৬৮ শতাংশ কৃষিজমি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সমুদ্রও রেহাই পায়নি। উপসাগরীয় অঞ্চলের উষ্ণ ও অগভীর পানি দূষণকে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখে। যুদ্ধের কারণে মাইন, সোনার, জাহাজ চলাচল এবং তেল ছড়িয়ে পড়া সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ডুগং ও বিরল অ্যারাবিয়ান হাম্পব্যাক তিমির মতো প্রাণী নিরাপদে সরে যেতে পারে না। হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে হামলার পর ভারী জ্বালানি তেল সাগরে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা ভেসে গিয়ে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। একইভাবে তেল শোধনাগারে হামলার কারণে প্রবালপ্রাচীর, পাখি ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। দূষিত পানি শুধু প্রাণীকুল নয়, মাছ ধরা, সামুদ্রিক খাদ্য এবং পানযোগ্য পানি উৎপাদন ব্যবস্থাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।যুদ্ধ থেমে গেলেও এই ক্ষতি থামে না।
ধ্বংসপ্রাপ্ত কংক্রিটের ভবন পুনর্নির্মাণের সময় বিপুল কার্বন নির্গমন ঘটে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সরকারগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে পরিবেশ রক্ষা পিছিয়ে যায়। আন্তর্জাতিক সহায়তাও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত থাকে। এই ক্ষতি হঠাৎ চোখে পড়ে না। এটি একদিনে ঘটে না। বরং অসংখ্য ছোট ছোট আঘাতে প্রকৃতি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। যুদ্ধ কেবল মানুষের জীবনই নয়, আমাদের সবুজ পৃথিবীকেও নীরবে আঘাত করে। আর সেই আঘাতের প্রতিধ্বনি বহু বছর ধরে থেকে যায়।