বজ্রপাত কেন হয়? হলে কি করবেন

বজ্রপাত কেন হয়? হলে কি করবেন

Hossain Hawlader
লেখকঃ Hossain Hawlader
5 মিনিট পড়তে লাগবে

জাতিসংঘের তথ্য মতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ৩০০ মানুষ বজ্রপাত এ মারা যায়, সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে মারা যায় মাত্র ২০ জন, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ বজ্রপাতের অন্যতম হটস্পট, আর সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সিলেটে, সাধারণত এপ্রিল–মে মাসে, অর্থাৎ বৈশাখে বজ্রপাত বেশি দেখা যায়, শৈশবে শোনা যায় মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে বজ্রপাত হয়, যেমন দুটি পাথর ঘষলে তাপ উৎপন্ন হয়ে আগুন জ্বলে ওঠে, তেমনি মেঘের মধ্যেও শক্তির জন্ম হয়, এই ধারণার পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

স্থির তড়িৎ বুঝতে হলে আগে জানতে হবে চার্জ সম্পর্কে, সব বস্তু অসংখ্য ক্ষুদ্র কণা দিয়ে গঠিত, যাকে পরমাণু বলা হয়, প্রতিটি পরমাণুর কেন্দ্রে নিউক্লিয়াস থাকে, এর মধ্যে প্রোটন ও নিউট্রন থাকে, প্রোটন ধনাত্মক আধানযুক্ত, নিউট্রন নিরপেক্ষ, আর নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘুরতে থাকে ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রোটন ও ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান থাকায় পরমাণু তড়িৎ নিরপেক্ষ থাকে, তবে সংস্পর্শে এলে এক বস্তু অন্য বস্তু থেকে ইলেকট্রন গ্রহণ বা ত্যাগ করতে পারে, ফলে একটি বস্তু ঋণাত্মক এবং অন্যটি ধনাত্মক চার্জযুক্ত হয়ে যায়।

বজ্রপাত

শীতকালে প্লাস্টিকের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে কাগজের টুকরোর কাছে ধরলে কাগজ চিরুনিতে লেগে যায়, কারণ ঘর্ষণের ফলে চুল থেকে ইলেকট্রন চিরুনিতে চলে গিয়ে চিরুনি ঋণাত্মক চার্জিত হয়, অপরদিকে কাগজ তড়িৎ আবেশের মাধ্যমে ধনাত্মক চার্জ ধারণ করে, ফলে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, এই ঘটনাই স্থির তড়িৎের একটি সহজ উদাহরণ। তড়িৎ আবেশ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একটি চার্জিত বস্তুর প্রভাবে একটি নিরপেক্ষ পরিবাহী সাময়িকভাবে চার্জিত হয়, এতে পরিবাহীর দুই প্রান্তে বিপরীতধর্মী চার্জ সৃষ্টি হয়, চার্জিত বস্তু সরিয়ে নিলে আবার নিরপেক্ষ অবস্থা ফিরে আসে, যেমন কাচদণ্ড রেশম দিয়ে ঘষে ধনাত্মক চার্জিত করলে কাছে আনা পরিবাহীর এক পাশে ঋণাত্মক এবং অন্য পাশে ধনাত্মক চার্জ তৈরি হয়।

মেঘও ঠিক একইভাবে চার্জিত হয়, সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়ে উপরে উঠে, পরে ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে, এই প্রক্রিয়ায় পানিকণার সংঘর্ষে ইলেকট্রন আদান–প্রদান ঘটে, ফলে কিছু কণা ধনাত্মক এবং কিছু কণা ঋণাত্মক চার্জ ধারণ করে, এতে মেঘের মধ্যে স্থির বিদ্যুৎ জমা হয়, এই চার্জগুলো নিরপেক্ষ হতে চায়, কিন্তু মাঝখানে কুপরিবাহী বায়ু বাধা সৃষ্টি করে, যখন চার্জের পার্থক্য অত্যন্ত বেশি হয়ে যায়, তখন হঠাৎ করে বিদ্যুৎ নির্গত হয়, এটিই বজ্রপাত।

বজ্রপাত তিন ধরনের, ক্লাউড লাইটনিং, ক্লাউড টু ক্লাউড লাইটনিং এবং ক্লাউড টু গ্রাউন্ড লাইটনিং, মেঘের ভেতরের বজ্রপাত সাধারণত কম শক্তিশালী, এক মেঘ থেকে অন্য মেঘে বজ্রপাত হলে আলো ও শব্দ সৃষ্টি হয়, আর মেঘ থেকে মাটিতে বজ্রপাত সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এতে মেঘের ঋণাত্মক চার্জ ও ভূপৃষ্ঠের ধনাত্মক চার্জ একত্রিত হয়।

বিদ্যুৎ হলো পরিবাহীর মধ্যে ইলেকট্রনের প্রবাহ, কিন্তু বজ্রপাত এর ক্ষেত্রে বাতাস সাধারণত কুপরিবাহী হওয়ায় সরাসরি প্রবাহ সম্ভব হয় না, মেঘে জমা হওয়া বিপুল চার্জ একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে, যার ভোল্টেজ প্রায় ১০ কোটি ভোল্ট পর্যন্ত হতে পারে, এত বেশি ভোল্টেজে বাতাস আয়নিত হয়ে প্লাজমায় পরিণত হয়, এই প্লাজমা বিদ্যুৎ চলাচলের পথ তৈরি করে দেয়, ফলে মুহূর্তেই চার্জের মিলন ঘটে এবং বজ্রপাত সৃষ্টি হয়। বজ্রপাতের সময় সৃষ্ট স্ফুলিঙ্গের পেছনে রয়েছে জারণ-বিজারণ বিক্রিয়া, আয়নিত বাতাস অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে উজ্জ্বল আলো তৈরি করে, এটি ঠিক তারে তারে স্পর্শ করলে আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হওয়ার মতোই ঘটনা, তাই বজ্রপাতের আলো আসলে শক্তির দৃশ্যমান বিস্ফোরণ।

মেঘের গর্জন বা বজ্রধ্বনি তৈরি হয় তীব্র তাপ ও চাপের কারণে, বজ্রপাতের সময় বাতাসের তাপমাত্রা প্রায় ২৭ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে, যা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি, এই তাপে বাতাস দ্রুত প্রসারিত হয় এবং আশপাশের ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রচণ্ড শব্দ সৃষ্টি হয়, এটিই মেঘের গর্জন।

আরো পড়ুনঃ আকাশে বজ্রপাত কেন হয়?

একটি বজ্রপাত থেকে প্রায় ১০০ কোটি জুল শক্তি উৎপন্ন হতে পারে, যা দিয়ে একটি ১০০ ওয়াটের বাল্ব প্রায় ৩৯ মাস পর্যন্ত জ্বালানো সম্ভব, পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০০টি বজ্রপাত ঘটে, এর এক-তৃতীয়াংশ মাটিতে আঘাত করে, বেশির ভাগ বজ্রপাত সাগরে এবং ক্রান্তীয় অঞ্চলে ঘটে, বজ্রপাত সাধারণত খুব অল্প সময়, প্রায় ৬০ থেকে ৭০ মাইক্রোসেকেন্ড স্থায়ী হয়।

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে খোলা মাঠে বা গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়, পানির কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে, মোটরসাইকেল বা সাইকেল থেকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে হবে, বাড়ির বৈদ্যুতিক যন্ত্রের প্লাগ খুলে রাখা ভালো, ফাঁকা স্থানে থাকলে মাথা নিচু করে বসে পড়া নিরাপদ, গাড়িতে থাকলে জানালা বন্ধ রাখতে হবে এবং ধাতব অংশ স্পর্শ করা যাবে না, সতর্ক থাকলে বজ্রপাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

সূত্র: বিজ্ঞানচিন্তা

শেয়ার করুন
লেখকঃHossain Hawlader
অনুসরণ করুন
আমি হোসাইন হাওলাদার। আমি mehrab360.com এ একজন সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। আমি সরকারি ব্রজলাল কলেজ, খুলনা এর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ইমেইল: [email protected]
মন্তব্য করুন