Gregor Mendel

মেন্ডেল কে ছিলেন? আধুনিক জিনতত্ত্বের জনক বলে পরিচিত গ্রেগর জোহান মেন্ডেল (১৮২২-১৮৮৪) অস্ট্রিয়াবাসী একজন ধর্মযাজক ছিলেন। দীর্ঘ সাত বছর বিভিন্ন মটরশুঁটি (Pea) গাছের উপর নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে তিনি বংশগতির দুটি “সূত্র” প্রবর্তন করেন। তাঁর সূত্রগুলোকে মেন্ডেলের সূত্র বা মেন্ডেলিজম (Mendelism) বলে আখ্যায়িত করা হয়। মেন্ডেল প্রদত্ত তত্ত্ব বর্তমান জিনতত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।


মেন্ডেলের সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ 

কৃষকের সন্তান জোহান মেন্ডেল-এর জন্ম ১৮২২ সালে অস্ট্রিয়ায়। তাঁর স্বপ্ন ছিল শিক্ষক ও বিজ্ঞানী হবেন। কিন্তু দারিদ্র্যের কষাঘাতে তাঁর সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা ধুলিসাৎ হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণ ত্যাগ করে তিনি অস্ট্রিয়ার ব্রুন (Brunn) শহরে অবস্থিত গির্জায় শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন।

১৮৫৭ সালে মেন্ডেল ৩৪ প্রকার মটরশুঁটি (Pisum sativum) সংগ্রহ করে গির্জা সংলগ্ন বাগানে উদ্ভিদের বংশগতি রহস্য উদঘাটনের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। দীর্ঘ সাত বছরের কঠিন ও শ্রমসাধ্য পরীক্ষা শেষে তিনি বংশগতির দুটি সূত্র (Law) আবিষ্কার করেন। তাঁর পরীক্ষার সমস্ত কাগজপত্র ১৮৬৬ সালে ব্রুন ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি (Natural History Society of Brunn)-তে জমা দেন। আপাতদৃষ্টিতে অতি সাধারণ এ পরীক্ষার গুরুত্ব ঊনবিংশ শতাব্দীতে কেউ উপলব্ধি করতে পারেননি। ১৮৮৪ সালের ৬ই জানুয়ারি, তাঁর সূত্রগুলো প্রতিষ্ঠা লাভের অনেক আগেই, মেন্ডেল মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর ১৬ বছর পর অর্থাৎ ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে তিন ভিন্ন দেশের তিন বিজ্ঞানী পৃথকভাবে কিন্তু একই সময়ে মেন্ডেলের গবেষণার ফলাফল পুনরাবিষ্কার করেন।


বিজ্ঞানীরা হলেনঃ

১. নেদারল্যান্ডসের উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিউগো ডে ক্রিস (Hugo de Vries, 1848-1935),

২. জার্মানির উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক কার্ল করেন্স (Car) Correns, 1864-1933) এবং

৩. অস্ট্রিয়ার কৃষিবিজ্ঞানী এরিক চের্মেক (Erich Tschermak, 1871-1962)

আশ্চর্যের বিষয় হলো এ বিজ্ঞানীরা তাঁদের সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করেই মেন্ডেলের গবেষণা সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন। এভাবে মেন্ডেলের গবেষণার মাধ্যমে বংশগতির মৌলিক সূত্রের আবিষ্কার ও প্রকাশের মাধ্যমে যে ভিত্তি রচিত হয় তার উপর নির্ভর করে জীববিজ্ঞানে বংশগতিবিদ্যা বা জিনতত্ত্ব নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার বিকাশ ঘটে। এ কারণে মেন্ডেলকে বংশগতিবিদ্যা বা জিনতত্ত্বের জনক (Father of Genetics) বলে অভিহিত করা হয়।


পরীক্ষার জন্য মেন্ডেলের মটরগাছ বেছে নেয়ার কারণ

বাগানের মটরগাছে (garden pea, Pisum sativum) নিমোক্ত কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হওয়ায় মেন্ডেল তাঁর পরীক্ষার জন্য মটরগাছকে নমুনা হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।

১. মটরগাছ একবর্ষজীবী হওয়ায় খুবই সহজেই বাগানের জমিতে ও টবে ফলানো যায়।

২. মটরগাছের প্রতিটি জনুর আয়ুষ্কাল অল্প হওয়ায় খুব কম সময়ের মধ্যেই সংকরায়ন পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়।

৩. মটরফুল উভলিঙ্গ হওয়ায় সহজেই স্ব-পরাগায়ন ঘটে।

৪. মটরফুল স্ব-পরাগী হওয়ায় বাইরে থেকে আসা অন্য কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সহজে মিশে যেতে পারে না, ফলে বংশপরম্পরায় নির্দিষ্ট চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শুদ্ধ সন্তান-সন্ততি উৎপাদন সম্ভব।

৫. ফুলগুলো আকারে বড় হওয়ায় মটর গাছে খুব সহজেই পরপরাগায়নও ঘটানো সম্ভব হয়।

৬. মটরগাছে সুস্পষ্ট তুলনামূলক বংশগতি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়-এ জন্য মটর গাছের বহু প্রকরণ (varieties) উপস্থিত।

৭. সংকরায়নের ফলে সৃষ্ট বংশধরগুলো উর্বর (fertile) হয়;


মেন্ডেলের সাফল্যের বা কৃতকার্য হওয়ার কারণ

মেন্ডেলের আগেও অনেক বিজ্ঞানী সংকরায়ন পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু মেন্ডেলই প্রথম এ ধরনের পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে কতকগুলো নির্ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। তাঁর এই সাফল্যের মূল কারণগুলো হচ্ছে-

১. তিনি মটরশুঁটি গাছ নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন, এ গাছ স্বপরাগী। ফুলের বিশেষ গঠনের জন্য বিপরীত পরাগায়নের সম্ভাবনা কম থাকায় পরীক্ষায় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম।

২. তিনি বিভিন্ন পরীক্ষায় যে সব উদ্ভিদ ব্যবহার করেছিলেন সেগুলো খাঁটি (pure) অর্থাৎ হোমোজাইগাস ছিল।

৩. তাঁর বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রতিজোড়া জিনের একটি জিন অন্য জিনের উপর সম্পূর্ণ প্রকট (dominant) ছিল।

৪. মটরশুঁটির ডিপ্লয়েড কোষে সাতজোড়া ক্রোমোজোম আছে।

৫. মেন্ডেল যে সাতজোড়া চরিত্র নিয়ে কাজ করেছিলেন, সেগুলো ভিন্ন ভিন্ন ক্রোমোজোমে অবস্থিত বলে কোন লিংকেজ (linkage) সংক্রান্ত ঝামেলা ঘটেনি। 

৬. কোন লিংকড চরিত্রের সম্মুখীন হলে মেন্ডেল হয়তোবা দ্বিতীয় সূত্রের ব্যাখ্যা দানে ব্যর্থ হতেন। কিন্তু অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয় মেন্ডেলের নির্ধারিত সাতজোড়া চরিত্রের মধ্যে কোনটাই লিংকড চরিত্র ছিলনা।

৭. সংকরায়ন করার আগে তিনি বারবার উদ্ভিদগুলোর বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করেছেন।

৮. কোন স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য তিনি কয়েক বংশধরে উদ্ভিদগুলোর প্রজনন ঘটিয়েছেন।

৯. মেন্ডেল অত্যন্ত সতর্কতা ও নিষ্ঠার সাথে তাঁর গবেষণার ফলাফল লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

১০. গাণিতিক পদ্ধতিতে মেন্ডেল তাঁর ফলাফলের অর্থপূর্ণ ব্যাখ্যা করেছিলেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *