জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিক মহাসাগরের রাসায়নিক গঠনে এমন পরিবর্তন ঘটছে, যা বিজ্ঞানীরা প্রায় অপরিবর্তনীয় বলে মনে করছেন। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলের সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষকদের মতে, সামুদ্রিক বরফ দ্রুত গলে যাওয়ায় সমুদ্রে নাইট্রেট নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে প্ল্যাঙ্কটন, মাছ, সামুদ্রিক পাখি এবং সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর ওপর।
আর্কটিক মহাসাগরের খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি হলো প্ল্যাঙ্কটন। এই ক্ষুদ্র জীবগুলোর বেড়ে ওঠার জন্য নাইট্রেট অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু নাইট্রেটের মাত্রা কমে গেলে প্ল্যাঙ্কটনের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে খাদ্যশৃঙ্খলের ওপরের স্তরের প্রাণীরাও পর্যাপ্ত খাবার পায় না। এতে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গবেষণায় আরও জানা গেছে, আগে যে বিশাল সমুদ্র এলাকা বরফে ঢাকা থাকত, এখন সেই অঞ্চলগুলো সূর্যের আলোয় উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে। এতে সমুদ্রতলের একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক প্রক্রিয়া দ্রুততর হচ্ছে, যাকে বেন্থিক ডিনাইট্রিফিকেশন বলা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় নাইট্রেট ভেঙে নাইট্রোজেন গ্যাসে পরিণত হয় এবং পানি থেকে হারিয়ে যায়। ফলে সমুদ্রে পুষ্টির ঘাটতি আরও বেড়ে যাচ্ছে। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আর্কটিক মহাসাগরের ফ্রেম প্রণালী থেকে সংগ্রহ করা ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই পরিবর্তনের প্রমাণ পেয়েছেন। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০৯ সালের পর থেকে আর্কটিক থেকে বেরিয়ে আসা জলে নাইট্রেটের মাত্রা ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সময় থেকেই আর্কটিকে সামুদ্রিক বরফের দ্রুত হ্রাস স্পষ্টভাবে শুরু হয়েছিল। নাইট্রেটের এই হ্রাস শুধু সামুদ্রিক প্রাণীকেই নয়, পৃথিবীর জলবায়ুকেও প্রভাবিত করতে পারে। কারণ প্ল্যাঙ্কটন সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে।
প্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ কমে গেলে সমুদ্রের কার্বন ধরে রাখার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। গবেষকরা মনে করছেন, আর্কটিক মহাসাগর এখন এমন এক পরিবর্তনের পথে চলে গেছে, যেখান থেকে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ভবিষ্যতে এই অঞ্চল হয়তো কেবল ছোট আকারের প্ল্যাঙ্কটনকেই টিকিয়ে রাখতে পারবে।
এর ফলে বড় মাছ, সামুদ্রিক পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীদের খাদ্য সরবরাহ কমে যাবে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, আর্কটিক মহাসাগরের এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু উত্তর মেরুতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উত্তর আটলান্টিক সহ বিশ্বের অন্যান্য সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য এবং বাণিজ্যিক মৎস্য শিকারেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে আরও গভীর গবেষণা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।