টিভির পর্দায় নিশ্চয়ই রাজকীয় কোনো ঐতিহাসিক মুভি দেখেছেন; মুভিতে রাজা-রানিরা চমৎকার পোশাক পরে বিশাল প্রাসাদে বসে আছেন, কিংবা তলোয়ার হাতে যোদ্ধারা তীব্র লড়াই করছেন। সব মিলিয়ে দারুণ এক পরিবেশ। কিন্তু একটু ভালো করে খেয়াল করলেই একটা বিশাল ভুল চোখে পড়বে। তাদের সবার দাঁত একদম ঝকঝকে সাদা আর নিখুঁত! বাস্তবে কিন্তু পুরোনো যুগের মানুষদের এমন সুন্দর দাঁত থাকার কোনো উপায় ছিল না। মানব ইতিহাসের অনেকটা সময় জুড়েই মানুষ সাদা দাঁতের কদর করেছে ঠিকই, কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবে আমাদের পূর্বপুরুষদের দাঁতে প্রচুর ক্ষয় হতো, দাঁতের ব্যথায় তারা কষ্ট পেতেন এবং সেই ক্ষয় বাইরে থেকেও দেখা যেত।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে এখন আর আগের যুগের মতো ভয়ংকর দাঁতের রোগে ভুগতে হয় না। কিন্তু তৈরি হয়েছে নতুন এক দুশ্চিন্তা দাঁত কতটা সাদা! আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে শুধু মার্কিনীরাই দাঁত সাদা করার নানা জিনিসপত্র ও কসমেটিক চিকিৎসায় প্রায় ৮২১ কোটি ডলার খরচ করবে। ভাবা যায়, শুধু দাঁত সাদা করার পেছনে এত বিপুল অর্থ! কিন্তু প্রশ্ন হলো, দাঁত ঝকঝকে সাদা হলেই কি তা সম্পূর্ণ সুস্থ? দাঁতের চিকিৎসকেরা কিন্তু তা মনে করেন না।
সবার দাঁত জন্ম থেকেই মুক্তোর মতো সাদা হয় না। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ডেন্টিস্ট্রির সহযোগী অধ্যাপক এবং জেনারেল ক্লিনিক্যাল ডেন্টিস্ট্রির প্রধান ডায়ানা নগুয়েন জানান, দাঁতের রং ভিন্ন হওয়ার পেছনে নানা কারণ রয়েছে এর কিছুটা নির্ভর করে জিন বা বংশগতির ওপর, আবার কিছুটা নির্ভর করে জন্মের আগের সময়ের ওপর। যেমন, গর্ভাবস্থায় মা যদি নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ খান, তবে শিশুর দাঁত কালচে বা ধূসর আভা পেতে পারে।
দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস দাঁতের রং বদলানোর সবচেয়ে বড় কারণ। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ ও ফ্লস না করলে দাঁতে ব্যাকটেরিয়ার আস্তরণ জমে, যা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে টারটার তৈরি করে। এই টারটার সহজেই তামাক, কফি বা খাবারের রং শোষণ করে। সহজ ভাষায়, যা সাদা টি-শার্টে দাগ ফেলে, তা দাঁতেও দাগ ফেলে! টারটার শুধু রং নষ্ট করে না, ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আটকে রেখে মাড়ির ক্ষতি করে এবং দাঁতে গর্ত তৈরি করে।
অনেকেই মনে করেন, দাঁতে হলদে, কালচে বা ধূসর দাগ মানেই দাঁত অসুস্থর ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। কেউ হয়তো অনেক টাকা খরচ করে দাঁত ঝকঝকে সাদা করেছে, কিন্তু সেই নিখুঁত হাসির আড়ালেই থাকতে পারে বড় কোনো সমস্যা। বেশির ভাগ দাঁতের ক্ষয় শুরু হয় দুই দাঁতের মাঝখান থেকে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। গর্ত বড় না হওয়া পর্যন্ত দাঁতের বাইরের রং সাধারণত বদলায় না।
দাঁত সাদা করার অন্ধ প্রতিযোগিতায় অনেকেই নিজেদের অজান্তেই ক্ষতি করছেন। খুব জোরে ব্রাশ করা বা কাঠকয়লা মেশানো খসখসে টুথপেস্ট ব্যবহার করলে দাঁতের উপরের সুরক্ষামূলক স্তর এনামেল ক্ষয়ে যায় আর এনামেল একবার ক্ষয়ে গেলে তা আর ফিরে আসে না।
আবার অনেকেই ভিনিয়ার পদ্ধতি বেছে নেন, যেখানে দাঁতের ওপর কৃত্রিম সাদা আবরণ বসানো হয়। শুনতে আকর্ষণীয় হলেও এটি একটি তীব্র ও কষ্টদায়ক প্রক্রিয়া, কারণ এই আবরণ বসানোর জন্য সুস্থ দাঁতের একটি অংশ যান্ত্রিকভাবে কেটে ফেলতে হয়। এরপর সারাজীবন সেই কৃত্রিম স্তরের যত্ন নিতে হয়। শুধু সৌন্দর্যের জন্য সুস্থ দাঁত কাটার সিদ্ধান্ত মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়।
তাহলে কি দাঁত সাদা করা উচিত নয়? চিকিৎসকেরা বলেন, হালকা দাগ থাকলে ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে সাধারণ স্কেলিং বা পলিশ করলেই যথেষ্ট। তবে এর চেয়ে বেশি কিছু করার আগে অবশ্যই দাঁতের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। দাঁতে ক্যাভিটি বা ক্ষয় থাকলে আগে সেই সমস্যার চিকিৎসা জরুরি কারণ চিকিৎসকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোগী যেন ঠিকমতো কথা বলতে পারে, খাবার চিবোতে পারে এবং ব্যথামুক্ত থাকে।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে নিখুঁত ছবি দেওয়ার এক অদ্ভুত চাপ কাজ করে। ফিল্টারের ঝলকে হাসি আরও উজ্জ্বল করা যেন এক নতুন স্বাভাবিকতা। হলিউড তারকাদের মতো সাদা, ঝকঝকে হাসির এই ধারণা অনেক দিন ধরেই ছিল, আর এখন সোশ্যাল মিডিয়া সেই চাপে নতুন রঙ যোগ করেছে।
সূত্র: পপুলার সায়েন্স