প্রাচীন মিশরীয় মমির গোপন রহস্য উন্মোচন করল মেডিকেল স্ক্যানকয়েক হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরে মৃত মানুষের দেহকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করে মমি বানানো হতো, যেখানে শরীরের পচনশীল অঙ্গ বের করে লবণ দিয়ে শুকিয়ে লিনেন কাপড়ে জড়িয়ে রাখা হতো। দীর্ঘদিন ধরে এসব মমির ভেতরের তথ্য জানতে গবেষকদের কাপড় খুলতে হতো, যা অনেক সময় মমির ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াত, তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নত প্রযুক্তি এখন সেই ঝুঁকি দূর করেছে এবং কোনো সুতো না ছুঁয়েই মমির ভেতরের রহস্য জানা সম্ভব হচ্ছে। হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে অবস্থিত সেমেলউইস মিউজিয়াম অব মেডিকেল হিস্ট্রিতে সংরক্ষিত প্রাচীন মিসরীয় মমিগুলোর ওপর গবেষণা চালাতে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করছেন হাই-রেজোলিউশন সিটি স্ক্যান প্রযুক্তি, যা ঘূর্ণায়মান এক্সরে ও কম্পিউটারের সাহায্যে বস্তু বা দেহের অভ্যন্তরের সূক্ষ্ম ২ডি ও ৩ডি ছবি তৈরি করে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মমির অভ্যন্তরীণ গঠন, সংরক্ষণ কৌশল এবং সম্ভাব্য রোগ বা অস্বাভাবিকতা নির্ণয় করা যাচ্ছে কোনো ক্ষতি ছাড়াই।
সেমেলউইস ইউনিভার্সিটির মেডিকেল ইমেজিং সেন্টারের রেডিওলজিস্ট ইবোলকা দুদাসের মতে, এই গবেষণার উদ্দেশ্য হলো মমির ভেতরের কাঠামোর নিখুঁত চিত্র পাওয়া, যাতে বোঝা যায় হাজার বছর আগে কীভাবে মৃতদেহ সংরক্ষণ করা হতো; নতুন প্রজন্মের ফোটন কাউন্টিং ডিটেক্টরযুক্ত সিটি স্ক্যানার ব্যবহারের ফলে আগের তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্ট ও বিস্তারিত ছবি পাওয়া যাচ্ছে। জাদুঘরের কিউরেটর ক্রিস্টিনা শেফার জানিয়েছেন, আগেও মমিগুলো নিয়ে গবেষণা করা হয়েছিল, তবে নতুন প্রযুক্তির ফলে এখন আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। ইতিমধ্যে ছয়টি মমির কার্বন ডেটিং করে জানা গেছে, সবচেয়ে পুরোনোটি প্রায় ২৪০০ বছর আগের, যদিও মিসরীয়রা আরও বহু আগে থেকেই মমি তৈরি করত। সিটি স্ক্যান প্রযুক্তি শুধু চিকিৎসায় নয়, প্রাচীন জীবাশ্ম, পোকামাকড়ের ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক এমনকি মহাকাশ থেকে আসা উল্কাপিণ্ড বিশ্লেষণেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই পদ্ধতিতে কোনো বস্তুর ক্ষতি না করেই তার ভেতরের তথ্য পরিষ্কারভাবে দেখা যায়, ফলে মমির ভাঁজে লুকানো তাবিজ, মুদ্রা বা মূল্যবান বস্তু সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। বিশ্বের বিভিন্ন মমি গবেষণায় ইতিমধ্যে জানা গেছে প্রাচীন মানুষের নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যা যেমন আর্থ্রাইটিস, অ্যানিমিয়া এমনকি ক্যানসারের উপস্থিতিও। দক্ষিণ আমেরিকার কিছু মমি স্ক্যান করে গণহত্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে, আর বিখ্যাত ফারাও তুতেনখামেন-এর মমির স্ক্যান থেকে জানা যায়, ম্যালেরিয়া ও পা ভাঙার জটিলতার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। সেমেলউইস জাদুঘরের একটি রহস্যময় মমি প্যাকেট স্ক্যান করে গবেষকরা অবাক হয়েছেন, কারণ বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ভেতরে পাওয়া গেছে মানুষের একটি কাটা পা।
অন্য একটি মমির ক্ষেত্রে জানা গেছে, সেই ব্যক্তি হাড় ক্ষয়ের রোগে ভুগছিলেন, যা প্রাচীন মানুষের স্বাস্থ্য সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে।আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তি মমি গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছে, যা হাজার বছরের পুরোনো নিদর্শনের ভেতরে লুকানো ইতিহাসকে ক্ষতি ছাড়াই উন্মোচন করছে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও অজানা তথ্য সামনে আসবে, যা আমাদের অতীত সভ্যতা সম্পর্কে ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
তথ্যসূত্রঃ বিজ্ঞানচিন্তা