বিজ্ঞানীদের চোখে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা

বিজ্ঞানীদের চোখে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা

সাক্ষাৎকার

Hossain Hawlader
লেখকঃ Hossain Hawlader
6 মিনিট পড়তে লাগবে

আমি ন্যাশভিলের শেলবি পার্ক থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসার সময় আমি যতটা দৃঢ়সংকল্প নিয়ে গাড়ি চালিয়েছিলাম, ততটা আর কখনও চালাইনি। আমরা ডেভিডসন স্ট্রিটে পৌঁছাতেই আমার স্বামী চিৎকার করে বললেন, “ঐ! ঐ যে সূর্যের আলো!” আমি এক মুহূর্ত দেরি না করে গাড়িটা স্কিড করে একটা প্রিন্টিং কোম্পানির কার পার্কে ঢুকিয়ে দিলাম। আমরা গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামলাম, চোখে সানগ্লাস পরলাম এবং দ্রুত অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকালাম। সূর্যটা মেঘে ঢাকা ছিল, কিন্তু আলোর একটা সরু ফালি তখনও জ্বলজ্বল করছিল। সেটা ছিল ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট, দুপুর ১টা ২৭ মিনিট। আমরা লন্ডন থেকে টেনেসি পর্যন্ত এসেছিলাম ‘গ্রেট আমেরিকান এক্লিপ্স’ দেখার জন্য, এমন এক মহাজাগতিক ঘটনা যা আমি আগে কখনও দেখিনি।

ইতালিতে জন্ম নেওয়া একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে আমি বরাবরই নিজেকে কিছুটা দুর্ভাগা মনে করতাম। আমার জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট রয়েছে, যার মূল বিষয় ছিল ছায়াপথগুলোর সংঘর্ষ। আমি ধূমকেতু, গ্রহসারি, অগ্নিগোলক, ছায়াপথ ও মেরুপ্রভার মতো অসংখ্য মহাজাগতিক ঘটনা দেখেছি, কিন্তু কখনও পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখিনি।২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যে আসার পর আমি ১৯৯৯ সালের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ নিয়ে অনেক গল্প শুনেছিলাম। আমি নিজে তা দেখতে পাইনি, কারণ ইতালি থেকে গ্রহণটি দেখা যাচ্ছিল না। অনেক বন্ধু বলেছিল, এই শতবর্ষে একবার ঘটা ঘটনাটির এক ঝলক দেখার জন্য তারা কর্নওয়ালে গিয়েছিল অথবা ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ফ্রান্সে পৌঁছেছিল। যুক্তরাজ্যে ২০৯০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরের আগে আর কোনো পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না। তখন মনে হয়েছিল, ভৌগোলিক নিয়তিই যেন আমাকে ঠকিয়েছে।

পরবর্তী ১৮ বছর আমি আংশিক সূর্যগ্রহণের পেছনে ছুটেছি। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে ৯০ শতাংশ আচ্ছাদন আর পূর্ণগ্রাসের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। পরে বুঝলাম, পার্থক্যটা আসলে বিশাল। ২০১৭ সালের সেই সকালে আকাশ ছিল ঝকঝকে পরিষ্কার। আমরা পাহাড়ের চূড়ায় একটি পার্কে বসে দুপুরের সেই বিস্ময়কর দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। গ্রহণ দেখার বিশেষ চশমা পরে আমরা ছোট একটি সৌর দূরবীন দিয়ে নিয়মিত সূর্য পর্যবেক্ষণ করছিলাম। এগুলো ছাড়া সূর্যের দিকে তাকানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে নিশ্চয়ই কেউ এই নক্ষত্রটিকে দেখতে চাইবে না।আমি যখনই কোনো জনবহুল জায়গায় টেলিস্কোপ বসাই, মানুষ সেটার চারপাশে ভিড় জমায়। সেদিনও অনেকে এই দৃশ্য দেখার জন্য জড়ো হয়েছিল। সবাই মহাবিশ্বের বিস্ময় আর আসন্ন সূর্যগ্রহণ নিয়ে কথা বলছিল। আমি তত্ত্ব জানতাম, কিন্তু অভিজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।

অবশেষে, দুপুরের ঠিক আগে আমরা দেখলাম চাঁদ ধীরে ধীরে সূর্যের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তারপর, পূর্ণগ্রাস শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট আগে সবচেয়ে খারাপ ঘটনাটা ঘটল, আকাশ ভরে গেল মেঘে। চারদিক থেকে ভেসে আসা ঘন মেঘ সূর্যকে ঢেকে ফেলছিল। আমরা বুঝতে পারলাম, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে হবে না। সূর্যগ্রহণ দেখতে হলে সূর্যের আলো যেদিকে দেখা যাচ্ছে, সেদিকেই যেতে হবে। আমরা দ্রুত গাড়িতে উঠে সূর্যের শেষ রশ্মিগুলোকে অনুসরণ করতে করতে সেই পার্কিং লটে পৌঁছে গেলাম। পূর্ণগ্রাস গ্রহণের মুহূর্তে চারপাশের পৃথিবী যেন বদলে যায়। চাঁদ যখন সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়, তখন চারদিকে এক অদ্ভুত গোধূলি নেমে আসে। সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল, করোনা, যা সাধারণত খালি চোখে দেখা যায় না, তখন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একটি মেঘ এসে ঢেকে দেওয়ার আগে আমরা মাত্র ৫০ সেকেন্ডের মতো গ্রহণটি দেখতে পেরেছিলাম, কিন্তু সেই সৌন্দর্য আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

পাখিরা নিচে নেমে এসে নিস্তব্ধ হয়ে গেল, যেন রাত নেমে আসছে। আমি আর আমার স্বামী আবেগে কেঁদে ফেললাম। আমি ভেবেছিলাম, শুধু একটি বিরল মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী হব। কিন্তু সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম, কী অবিশ্বাস্য কাকতালীয় ঘটনার ফলে এই সূর্যগ্রহণ সম্ভব হয়। আমরা এমন এক গ্রহে বাস করি, যেখানে চাঁদ ও সূর্যের আপাত আকার একই হওয়ায় আকাশে একটি আরেকটিকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে পারে। মঙ্গল গ্রহে এমনটা কখনও ঘটে না।

তখনই বুঝলাম কেন প্রাচীনকাল থেকে সূর্যগ্রহণকে কখনও দেবতাদের অশুভ বার্তা, কখনও শুভ সংকেত হিসেবে দেখা হতো। কেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ঘটনাগুলোর ভবিষ্যদ্বাণী করার চেষ্টা করেছেন। কারণ এই জ্ঞানের মধ্যেই ছিল শক্তি। আর তখনই মনে হলো, শুধু একটি সূর্যগ্রহণ দেখা যথেষ্ট নয়। আমাকে আরও দেখতে হবে।

২০২৪ সালের এপ্রিলে আমি ও আমার স্বামী দ্বিতীয় ‘গ্রেট আমেরিকান এক্লিপ্স’ দেখতে মেক্সিকো গিয়েছিলাম। মাজাতলানের একটি সৈকতে দাঁড়িয়ে আমরা চার মিনিটেরও বেশি সময় ধরে চাঁদকে সূর্যকে ঢেকে ফেলতে দেখেছি। এই অভিজ্ঞতা ২০১৭ সালের চেয়ে আলাদা ছিল। তখন সূর্য তার সৌরচক্রের শীর্ষ অবস্থায় ছিল, তাই তার বলয় আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। সূর্য কালো হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, হাজার হাজার মানুষের হাসি-ঠাট্টা আর আনন্দময় কথাবার্তা এক গভীর, প্রায় ধর্মীয় নীরবতায় রূপ নিল। আবারও আমাদের এই অসাধারণ মহাবিশ্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ জন্ম নিল।

এখন আমি নিজেকে একজন “গ্রহণ শিকারী” বলেই পরিচয় দিই। আমি ইতিমধ্যেই ১২ আগস্ট ২০২৬ এবং ২ আগস্ট ২০২৭ সালের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য স্পেনে ভ্রমণের টিকিট বুক করে ফেলেছি। এর মধ্যে ২০২৭ সালের গ্রহণটি হবে এই শতাব্দীর দীর্ঘতম পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের নিখুঁত অবস্থানের কারণে সেই পূর্ণগ্রাস ছয় মিনিটেরও বেশি সময় স্থায়ী হবে। এত দীর্ঘ যে হয়তো একসময় একঘেয়েও লাগতে পারে। কিন্তু আমি জানি, আমার কাছে এই মহাজাগতিক দৃশ্যের আকর্ষণ কখনও শেষ হবে না।

আলফ্রেডো কার্পিনেটির লেখা ‘ইনভিজিবল রেইনবোস’ বইটি ২১ মে প্রকাশিত হচ্ছে। বইটি প্রকাশ করছে উইলটন স্কোয়ার বুকস।

শেয়ার করুন
লেখকঃHossain Hawlader
অনুসরণ করুন
আমি হোসাইন হাওলাদার। আমি mehrab360.com এ একজন সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। আমি সরকারি ব্রজলাল কলেজ, খুলনা এর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ইমেইল: [email protected]
মন্তব্য করুন