নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, আজকাল প্রায় প্রতিটি ঘরেই পুরোনো হলুদ আলোর বৈদ্যুতিক বাতির জায়গা দখল করে নিয়েছে ঝকঝকে সাদা আলোর এলইডি বাল্ব। এই বাল্ব শুধু বেশি আলোই দেয় না, বিদ্যুৎ খরচও অনেক কমায়। কিন্তু ছোট্ট এই বাল্বের ভেতরে কী এমন প্রযুক্তি লুকিয়ে আছে, যা একে এত সাশ্রয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছে?
এলইডির পূর্ণরূপ লাইট-ইমিটিং ডায়োড। বাংলায় একে বলা হয় আলো নিঃসরণকারী ডায়োড। একটি এলইডি বাল্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে অর্ধপরিবাহী পদার্থ বা সেমিকন্ডাক্টর। এটি এমন এক ধরনের পদার্থ, যার বিদ্যুৎ পরিবহন ক্ষমতা সুপরিবাহী ও অপরিবাহী পদার্থের মাঝামাঝি। বিজ্ঞানীরা প্রয়োজন অনুযায়ী এই সেমিকন্ডাক্টরের বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এলইডির ভেতরে সাধারণত দুই ধরনের সেমিকন্ডাক্টর স্তর পাশাপাশি যুক্ত থাকে।
এই দুটি স্তরের একটির নাম অ্যানোড, অন্যটির নাম ক্যাথোড। ক্যাথোড স্তরে থাকে প্রচুর মুক্ত ইলেকট্রন। আর অ্যানোড স্তরে থাকে ইলেকট্রনের ঘাটতি, ফলে সেখানে তৈরি হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শূন্যস্থান। সহজভাবে বললে, এক পাশে অতিরিক্ত ইলেকট্রন, অন্য পাশে ইলেকট্রন গ্রহণ করার মতো খালি জায়গা থাকে। যখন বাল্বের সুইচ অন করা হয়, তখন এর ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হয়। সেই বিদ্যুৎ ক্যাথোডে থাকা ইলেকট্রনগুলোকে অ্যানোডের দিকে ঠেলে দেয়। ইলেকট্রনগুলো অ্যানোডে গিয়ে শূন্যস্থানগুলো পূরণ করে। আর ঠিক তখনই খুব অল্প পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়।
এই নির্গত শক্তিই ফোটন, যা আলোর ক্ষুদ্রতম কণা। অর্থাৎ, ইলেকট্রন যখন শূন্যস্থান পূরণ করে, তখন আলো তৈরি হয়। একটি এলইডি বাল্বের ভেতরে প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি বার এই প্রক্রিয়া ঘটে। এত দ্রুত ফোটন নির্গত হওয়ার কারণেই আমরা একটানা উজ্জ্বল আলো দেখতে পাই। এলইডি বাল্বের আলোর রংও এই প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। ভেতরে ব্যবহৃত সেমিকন্ডাক্টর পদার্থের রাসায়নিক গঠন এবং নির্গত শক্তির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে সাদা, নীল, লাল, সবুজসহ বিভিন্ন রঙের আলো তৈরি হয়।
এলইডি বাল্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ক্ষমতা। এটি সরাসরি বিদ্যুৎ শক্তিকে আলোতে রূপান্তরিত করে। ফলে শক্তির অপচয় অনেক কম হয়। পুরোনো ফিলামেন্ট বাল্বের তুলনায় এলইডি প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ফিলামেন্ট বাল্বে বিদ্যুতের বড় অংশ তাপে নষ্ট হয়ে যেত, কিন্তু এলইডিতে সেই অপচয় অনেক কম। শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ই নয়, এলইডি বাল্বের আয়ুও অনেক বেশি। একটি ভালো মানের এলইডি বাল্ব সাধারণত ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ঘণ্টা পর্যন্ত আলো দিতে পারে। পাশাপাশি এটি প্রায় ১৫ হাজার বার জ্বালানো ও নেভানোর চাপও সহজে সহ্য করতে পারে।
এই কারণেই এলইডি বাল্ব আজ শুধু একটি আলোর উৎস নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তির এক অসাধারণ উদাহরণ। কম বিদ্যুৎ খরচ, দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার এবং উজ্জ্বল আলো দেওয়ার ক্ষমতার কারণে এটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় আলোকসজ্জার মাধ্যমগুলোর একটি।
সূত্র: সায়েন্স ইলাস্ট্রেশন