আলোর গতির চেয়েও দ্রুতগামী ক্ষুদ্র কণা প্রত্যক্ষ করেছেন বিজ্ঞানীরা

আলোর গতির চেয়েও দ্রুতগামী ক্ষুদ্র কণা প্রত্যক্ষ করেছেন বিজ্ঞানীরা

Hossain Hawlader
লেখকঃ Hossain Hawlader
4 মিনিট পড়তে লাগবে

প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা এমন এক বিস্ময়কর ঘটনা শনাক্ত করেছেন, যেখানে শূন্য ফাঁকা বিন্দু বা ভয়েড আলোর গতির চেয়েও দ্রুত ছুটে চলছে, তবুও এতে আপেক্ষিকতার কোনো নিয়ম ভাঙছে না। শুনতে যেন মহাবিশ্বের নিয়ম ভেঙে পড়েছে, কিন্তু আসলে এখানে লুকিয়ে আছে এক সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক কৌশল। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই ভয়েডগুলো কীভাবে ত্বরণ পায়। গবেষকেরা আল্ট্রাফাস্ট ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপির উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বোরন নাইট্রাইডের পাতলা স্তরের ভেতরে চলমান ফনন-পোলারিটন তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করেন। ফনন-পোলারিটন হলো এক ধরনের কোয়াসিপার্টিকল, যা আলো (ফোটন) এবং ক্ষুদ্র কম্পনের মিশ্রণে তৈরি, এগুলো একসঙ্গে আলো ও শব্দ তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য বহন করে।

আলোর গতির চেয়েও দ্রুত ভয়েড

তরঙ্গকে আমরা সাধারণত একক ঢেউয়ের মতো কল্পনা করি, কিন্তু বাস্তবে এগুলো অনেকটা হ্রদের পানির মতো আচরণ করে। হ্রদের পানিতে অসংখ্য ঢেউ ও তরঙ্গ একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। যখন দুটি ঢেউ তাদের সর্বোচ্চ উচ্চতায় মিলিত হয়, তখন তারা আরও বড় ঢেউ তৈরি করে। আর যখন সর্বনিম্ন অবস্থায় মিলিত হয়, তখন তৈরি হয় আরও গভীর গর্ত বা খাদ। কখনো কখনো এমনও হয়, দুটি তরঙ্গ একে অপরকে পুরোপুরি বাতিল করে দেয়, ফলে এমন একটি বিন্দু তৈরি হয় যেখানে তরঙ্গের মান শূন্যে নেমে আসে। এই শূন্য বিন্দুগুলোকেই বলা হয় সিঙ্গুলারিটি বা ভয়েড।এই ভয়েডগুলো অনেকটা পানির ঘূর্ণির মতো আচরণ করে, যা নিজের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে অবস্থান পরিবর্তন করে। ১৯৭০-এর দশক থেকেই তত্ত্বে বলা হচ্ছিল, এই ধরনের সিঙ্গুলারিটি কিছু ক্ষেত্রে আলোর গতির চেয়েও দ্রুত চলতে পারে।

এখানে প্রশ্ন আসে। কীভাবে তারা আলোর গতির সীমা অতিক্রম করে? আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, শূন্যস্থানে আলোর গতি (প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার/সেকেন্ড) হলো সর্বোচ্চ গতি, যার বেশি বেগে কোনো বস্তু, শক্তি বা তথ্য চলতে পারে না। কিন্তু ভয়েড বা সিঙ্গুলারিটি কোনো বস্তু নয়, এতে নেই ভর, শক্তি বা তথ্য। এটি আসলে একেবারে শূন্য একটি বিন্দু। তাই এর ওপর সেই সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য হয় না।

আরো পড়ুনঃ ছাতার বা তাবুর কাপড়ের মধ্যদিয়ে পানি প্রবেশ করতে পারেনা কেন?

শুধু তাই নয়, এই ভয়েডগুলো কখনো কখনো আলোর গতিকে ছাড়িয়ে গিয়ে প্রায় অসীম গতির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। যখন দুটি সিঙ্গুলারিটি একে অপরের মুখোমুখি হয়, তখন তারা দ্রুত একে অপরের দিকে ছুটে আসে এবং মিলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে তাদের গতি নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। তবে সমস্যা হলো, তারা যত দ্রুত চলে, তাদের পর্যবেক্ষণ করা ততই কঠিন হয়ে ওঠে।এই গবেষণা শুধু ক্ষুদ্র ঘূর্ণি বা ভয়েড নিয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রকৃতির একটি সার্বজনীন নিয়ম উন্মোচন করেছে, যা সব ধরনের তরঙ্গের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হোক তা শব্দ তরঙ্গ, তরল প্রবাহ বা সুপার কন্ডাক্টরের মতো জটিল সিস্টেম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শূন্য বিন্দুগুলো অনেকটা কণার মতো আচরণ করে, ফলে বিজ্ঞানীরা এগুলো ব্যবহার করে কণার পারস্পরিক ক্রিয়া আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন। তবে একটি জায়গায় এসে এই তুলনা ভেঙে যায়। কণা কখনোই আলোর গতিকে অতিক্রম করতে পারে না, কিন্তু ভয়েড পারে।

সবশেষে, গবেষণায় ব্যবহৃত নতুন মাইক্রোস্কোপি প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের অনেক অজানা রহস্য উন্মোচনে সাহায্য করতে পারে। প্রকৃতির সবচেয়ে দ্রুত এবং সবচেয়ে অধরা মুহূর্তগুলোকে ধরার জন্য এটি যেন এক নতুন জানালা খুলে দিয়েছে। যেখানে, শূন্যতাও হয়ে উঠছে গতির এক বিস্ময়কর নায়ক।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

শেয়ার করুন
লেখকঃHossain Hawlader
অনুসরণ করুন
আমি হোসাইন হাওলাদার। আমি mehrab360.com এ একজন সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। আমি সরকারি ব্রজলাল কলেজ, খুলনা এর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ইমেইল: [email protected]
মন্তব্য করুন