আজ আমরা জানি, আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ২৯৯,৭৯২,৪৫৮ মিটার। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই মান অত্যন্ত নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এই পর্যায়ে পৌঁছাতে বিজ্ঞানকে অতিক্রম করতে হয়েছে কয়েক শতাব্দীর দীর্ঘ পথ। বর্তমানে লেজার, আলোকতরঙ্গের কম্পাঙ্ক এবং উন্নত পরিমাপ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আলোর গতি নির্ণয় করা হয়। তবে এই ইতিহাসের শুরু ছিল অনেক সাধারণ পর্যবেক্ষণ ও অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কৌতূহল দিয়ে। আলোর গতি প্রথম বোঝার ও পরিমাপের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনজন বিজ্ঞানী। তাঁরা হলেন গ্যালিলিও গ্যালিলেই, ওলে রোমার এবং জেমস ব্র্যাডলি।
গ্যালিলিওর প্রথম ধারণা
গ্যালিলিও গ্যালিলেই প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন যে আলো তাৎক্ষণিক নাও হতে পারে। তিনি লিখেছিলেন, “আলো তাৎক্ষণিক কি না জানি না, তবে যদি তাৎক্ষণিক না-ও হয়, তবু এটি এত দ্রুত যে একে ক্ষণিক বলাই যায়। “তিনি একটি পরীক্ষার পরিকল্পনা করেছিলেন। ইতালির তুস্কানির দুটি পাহাড়ের চূড়ায় দুই ব্যক্তি ঢাকা দেওয়া লণ্ঠন হাতে দাঁড়াবেন। প্রথম ব্যক্তি লণ্ঠনের আবরণ সরাবেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি আলো দেখামাত্র নিজের লণ্ঠনের আবরণ খুলবেন। এরপর প্রথম ব্যক্তি দেখবেন দ্বিতীয় লণ্ঠনের আলো সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়, নাকি কিছুটা সময় লাগে। বাস্তবে এই পরীক্ষা সফল হওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ আলোর গতি এত বেশি যে মানুষের প্রতিক্রিয়ার সময়ের তুলনায় সেই বিলম্ব ধরা অসম্ভব। তবুও গ্যালিলিও গুরুত্বপূর্ণ একটি সত্য উপলব্ধি করেছিলেন। আলো তাৎক্ষণিক নয়, বরং অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন।
ওলে রোমারের যুগান্তকারী আবিষ্কার
গ্যালিলিওর ধারণার প্রায় ৩৮ বছর পরে, ১৬৭৬ সালে ডেনমার্কের জ্যোতির্বিদ ওলে রোমার প্রথমবারের মতো আলোর সীমিত গতির বাস্তব প্রমাণ দেন। তিনি বৃহস্পতির উপগ্রহ আইওর গ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করেন। লক্ষ্য করেন, পৃথিবী যখন বৃহস্পতির দিকে এগিয়ে আসে তখন গ্রহণ প্রত্যাশার তুলনায় একটু আগে দেখা যায়। আবার পৃথিবী যখন বৃহস্পতি থেকে দূরে সরে যায়, তখন একই গ্রহণ কিছুটা দেরিতে দেখা যায়। রোমার বুঝতে পারেন, আইওর কক্ষপথের সময় বদলায়নি। পরিবর্তন হয়েছে আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে যে সময় লাগে, সেটিতে। পৃথিবী যত দূরে থাকে, আলোকে তত বেশি পথ অতিক্রম করতে হয়। ফলে গ্রহণ দেরিতে দেখা যায়।
ছয় মাসের ব্যবধানে সর্বোচ্চ প্রায় ২২ মিনিট বিলম্ব দেখা যায়। সেই তথ্য ব্যবহার করে পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা আলোর বেগ প্রায় ২১২,০০০ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড হিসেবে নির্ণয় করেন। যদিও রোমার নিজে এই মান প্রকাশ করেননি। তিনি শুধু দেখিয়েছিলেন, আলো তাৎক্ষণিক নয় এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছাতে সময় নেয়। প্রথমদিকে অনেক বিজ্ঞানী তাঁর ব্যাখ্যায় সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু পরে ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন্স ও আইজ্যাক নিউটন তাঁদের গবেষণায় রোমারের ফলাফলকে সমর্থন করেন। এর মাধ্যমে আলোর সীমিত গতি বিজ্ঞানজগতে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়।
জেমস ব্র্যাডলির নির্ভুল প্রমাণ
রোমারের মৃত্যুর প্রায় দুই দশক পরে, ১৭২৮ সালে ইংরেজ জ্যোতির্বিদ জেমস ব্র্যাডলি আলোর সীমিত গতির আরও শক্তিশালী প্রমাণ দেন। তিনি মূলত পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে কি না, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ খুঁজছিলেন। এজন্য গামা ড্রাকোনিস নক্ষত্রের অবস্থান দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু প্রত্যাশিত প্যারাল্যাক্সের পরিবর্তে তিনি একটি ভিন্ন ঘটনা আবিষ্কার করেন, যা পরে নাক্ষত্রিক অপেরণ নামে পরিচিত হয়। তিনি দেখেন, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে চলার কারণে চলন্ত পর্যবেক্ষকের কাছে নক্ষত্রের আলো সামান্য কাত হয়ে প্রবেশ করে। বৃষ্টির মধ্যে হাঁটার সময় যেমন ছাতা সামনের দিকে কাত করতে হয়, ঠিক তেমনি চলন্ত পৃথিবীতে অবস্থানকারী দূরবিনেও আলোর দিক সামান্য পরিবর্তিত হয়ে দেখা যায়। এই পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করে ব্র্যাডলি আলোর গতি পৃথিবীর কক্ষগত বেগের সঙ্গে তুলনা করেন। ফলাফল ছিল আধুনিক মানের খুব কাছাকাছি। তিনি দেখান, সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো পৌঁছাতে প্রায় ৮ মিনিট ১২ সেকেন্ড সময় লাগে।
ব্র্যাডলির আবিষ্কারের গুরুত্ব
ব্র্যাডলির গবেষণা একসঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রতিষ্ঠা করে।
- পৃথিবী সত্যিই সূর্যের চারদিকে পরিভ্রমণ করে।
- আলোর সীমিত গতির স্বাধীন ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়।
- আধুনিক নির্ভুল জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
তিনি প্রথমবার কৌণিক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পর্যন্ত অত্যন্ত নির্ভুল পরিমাপের পদ্ধতি চালু করেন। পরে ১৮৩৮ সালে ফ্রিডরিখ বেসেল এই পদ্ধতির ভিত্তিতেই প্রথম নক্ষত্রের দূরত্ব সফলভাবে নির্ণয় করতে সক্ষম হন। আলোর গতি নির্ণয়ের ইতিহাস শুধু একটি সংখ্যা আবিষ্কারের গল্প নয়। এটি বৈজ্ঞানিক চিন্তা, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ এবং যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণের এক অনন্য উদাহরণ। গ্যালিলিও প্রথম প্রশ্ন তুলেছিলেন, রোমার দেখিয়েছিলেন আলো সময় নিয়ে চলে, আর ব্র্যাডলি সেই ধারণাকে আরও নির্ভুলভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁদের গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি নির্মিত হয়েছে। আজ আমরা যে আলোর নির্ভুল গতি জানি, তার পেছনে রয়েছে এই তিন বিজ্ঞানীর শতাব্দীব্যাপী অসাধারণ অবদান।
লেখক: দীপেন ভট্টাচার্য, অধ্যাপক ও জ্যোতিঃপদার্থবিদ, মোরেনো ভ্যালি কলেজ, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।