আপনি হয়তো প্রতিদিন সকালে রুটির সঙ্গে কিংবা চায়ে চিনির বদলে এক চামচ মধু খাচ্ছেন। হয়তো ভাবছেন, মধু তো একেবারে খাঁটি প্রাকৃতিক জিনিস, চিনির চেয়ে নিশ্চয়ই অনেক স্বাস্থ্যকর! শত শত বছর ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে মধু ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে যাচাই করলে মধুর আসল রূপটা কেমন দাঁড়ায়? আপনি কি সত্যিই মধুর স্বাস্থ্যগুণের কথা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন? চলুন, আজ বিজ্ঞানের চোখে মধুর আসল গুণাগুণ মেপে দেখি।
মধু মূলত উদ্ভিদের ফুলের নির্যাস, যা মৌমাছিরা নিজেদের মতো করে ঘন করে তৈরি করে। এর বেশিরভাগ জুড়েই থাকে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ নামে সরল শর্করা। অনেকেই মনে করেন, সাদা চিনির চেয়ে মধু বেশি স্বাস্থ্যকর। কারণ, এটি কম প্রক্রিয়াজাত এবং এটি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে লাফিয়ে বাড়ে না। কিন্তু মধু আসলেই অন্যান্য শর্করার চেয়ে স্বাস্থ্যকর কি না, তা পুরোপুরি নির্ভর করে মৌমাছিরা ঠিক কোন ফুল থেকে নির্যাস সংগ্রহ করেছে তার ওপর।
চিনি ও মধুর মধ্যে তুলনা করতে হলে আমাদের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা জিআইয়ের সাহায্য নিতে হবে। জিআই দিয়ে মাপা হয়, কোনো খাবার কত দ্রুত আমাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। সাধারণ সাদা বা রিফাইন্ড চিনির জিআই হলো ৬৫। অন্যদিকে, মধুর জিআই নির্ভর করে এর উৎসের ওপর। যেমন, মধ্যপ্রাচ্যের সিদর গাছের ফুলের মধুর জিআই মাত্র ৩২। আবার গ্রিসের থাইম ফুলের মধুর জিআই ৮৫ পর্যন্ত হতে পারে।
এই পার্থক্যের মূল কারণ মধুতে থাকা গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজের অনুপাত। গ্লুকোজ খুব দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়, কিন্তু ফ্রুক্টোজ বাড়ায় না। সাদা চিনির জিআই সবসময় একই থাকে, কারণ এতে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ সমান অনুপাতে মিলে সুক্রোজ হিসেবে থাকে। কিছু মধুর জিআই কম হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, এগুলোতে ফেনোলিক অ্যাসিড ও ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো উপকারী উপাদান থাকে, যা আমাদের অন্ত্রে গ্লুকোজ শোষণের হার কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া এগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে, যা ক্যানসার বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সাহায্য করে। তবে সত্যি বলতে, এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়ার জন্য প্রচুর মধু খাওয়ার চেয়ে তাজা ফলমূল বা শাকসবজি খাওয়াই বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।
বাজারের প্রক্রিয়াজাত মধুর চেয়ে স্থানীয় খামার বা গ্রাম থেকে সরাসরি সংগ্রহ করা কাঁচা মধু বেশি স্বাস্থ্যকর। কারণ, প্রক্রিয়াজাত বা পাস্তুরিত করার সময় তাপের কারণে মধুর অনেক উপকারী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নষ্ট হয়ে যায়। তবে কাঁচা মধুর একটি ছোট্ট বিপদও আছে। এতে ক্লস্ট্রিডিয়াম বটুলিনাম নামে একধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা বটুলিনাম টক্সিন নামে ভয়ংকর নিউরোটক্সিন তৈরি করে। এই টক্সিন মাংসপেশি অবশ করে দেয়। এ কারণেই এটি রূপচর্চায় বোটক্স চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এটি ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। তাই ছোট শিশুদের কখনোই মধু খাওয়ানো উচিত নয়।
অন্যদিকে, বাজারে বিক্রি হওয়া অনেক বাণিজ্যিক মধুতে সস্তার চিনির সিরা মেশানো থাকে। এমনকি কিছু মধুতে যৌনশক্তি বর্ধক ওষুধের রাসায়নিক উপাদানও পাওয়া গেছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। তাই খাঁটি মধু চিনতে চাইলে রঙের দিকে খেয়াল রাখতে পারেন। সাধারণত গাঢ় রঙের মধুতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ বেশি থাকে।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, স্থানীয় মধু খেলে নাকি অ্যালার্জির সমস্যা কমে। এর পেছনের যুক্তি হলো, মধুতে থাকা সামান্য পরাগরেণু আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। কিন্তু এটি আসলে একটি ভুল ধারণা বা মিথ। কারণ, অ্যালার্জি হয় মূলত বাতাসে ওড়া পরাগরেণুর কারণে, মৌমাছির আনা রেণুর কারণে নয়। তবে সর্দি-কাশি বা গলাব্যথায় মধু সত্যিই দারুণ কাজ করে। ব্যাকটেরিয়াল বা ভাইরাল সংক্রমণে গলা খুসখুস করলে মধু আরাম দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের কাশির উপশমে সাধারণ কাশির ওষুধের মতোই কার্যকর মধু। লেবু-আদার চায়ের সঙ্গে এক চামচ মধু মিশিয়ে খেলে গলার আরামও অনেকটা বেড়ে যায়।
ক্ষত সারাতেও মধুর বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ক্ষত ড্রেসিং করার জন্য ‘মেডিকেল-গ্রেড মানুকা মধু’ ব্যবহার করা হয়। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মানুকা চা-গাছের ফুল থেকে তৈরি এই মধুতে মিথাইলগ্লাইক্সাল নামে শক্তিশালী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদান থাকে, যা সংক্রমণ দূর করতে সাহায্য করে।
তবে সব মধু উপকারী নয়। নেপাল ও তুরস্কের রডোডেনড্রন ফুলের নির্যাস থেকে তৈরি মধু খেলে মানুষের “ম্যাড হানি ডিজিজ” হতে পারে। এটি খেলে মাথা ঘোরে, বমি হয় এবং মানুষ মাতালের মতো আচরণ করে। ইতিহাসের পাতায় এই মধু জীবাণু অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে। ৬৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে উত্তর আনাতোলিয়ার পন্টাস রাজ্যের শাসক মিথ্রিডেটস সিক্সথ ইউপেটর তাঁর শত্রু রোমান সৈন্যদের চলার পথে কৌশলে এই মধুর চাক রেখে দিয়েছিলেন। রোমান সৈন্যরা লোভে পড়ে সেই মধু খেয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়।
চিনির চেয়ে মধু জাদুকরীভাবে অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর, এমনটা নয়। তবে এটি আমাদের জিভকে আনন্দ দেয়, সর্দি-কাশিতে ওষুধের মতো কাজ করে এবং চিনির তুলনায় কিছুটা হলেও ভালো বিকল্প হতে পারে। আর পরিমিত পরিমাণে নিজের চেনা খাঁটি মধু খেলে অন্তত রোমান সৈন্যদের মতো বিপদে পড়তে হবে না!