
আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখা এক বিজ্ঞানীর গল্পমানুষের চিরন্তন স্বপ্ন ছিল আকাশে ওড়া, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন উইলবার রাইট ও তাঁর ভাই অরভিল রাইট দুই ভাইয়ের এক অদম্য জুটি। তাঁদের হাত ধরেই জন্ম নেয় আধুনিক উড়োজাহাজ, আর মানুষ প্রথমবারের মতো আকাশে উড়ার সাহস পায়। ১৯০৩ সালের এক ঠান্ডা সকালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার কিটি হকের নির্জন সৈকতে দাঁড়িয়ে উইলবার তাকিয়ে ছিলেন আকাশের দিকে, যেখানে তাঁর ভাই অরভিল চালাচ্ছিলেন ইতিহাসের প্রথম সফল ইঞ্জিনচালিত উড়োজাহাজ।
কিছুক্ষণ পর নিজেও সেই যন্ত্রে চড়ে তিনি আরও দীর্ঘ সময় আকাশে ভেসে থেকে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম অমর করে দেন। ১৮৬৭ সালের ১৬ এপ্রিল ইন্ডিয়ানার মিলভিল শহরে জন্ম নেওয়া উইলবার ছিলেন বিশপ মিল্টন রাইট ও সুজান রাইটের তৃতীয় সন্তান; শৈশবে বাবার আনা একটি ছোট হেলিকপ্টার খেলনা তাঁদের মনে উড়ার স্বপ্নের বীজ বপন করে। ১৮৮৪ সালে হাই স্কুল শেষ করলেও দুর্ঘটনা ও মায়ের অসুস্থতার কারণে তাঁর উচ্চশিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, কিন্তু জ্ঞানের প্রতি তৃষ্ণা থামেনি। বরং আরও তীব্র হয়েছে। ভাই অরভিলের সঙ্গে তিনি ‘ওয়েস্ট সাইড নিউজ’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন, পরে মুদ্রণ ব্যবসা ও সাইকেলের দোকান চালান, যা তাঁদের যন্ত্রপাতি নিয়ে দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাকে শাণিত করে।
জার্মান উদ্ভাবক অটো লিলিয়েন্থালের কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে উইলবার বুঝতে পারেন, ডানার গঠন ও নিয়ন্ত্রণই উড়ানের মূল চাবিকাঠি; তাঁর সেই চিন্তা থেকেই বিমানের ডানাকে মোচড় দিয়ে দিক পরিবর্তনের ধারণা আসে। ১৯০১ সালে ‘অ্যাঙ্গেল অব ইন্সিডেন্স’ শীর্ষক গবেষণাপত্রসহ নানা লেখার মাধ্যমে তাঁরা বিমান চালনার তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তোলেন এবং একই বছর ওয়েস্টার্ন সোসাইটি অব ইঞ্জিনিয়ার্সে গ্লাইডিং পরীক্ষার ওপর বক্তৃতা দেন। অবশেষে ১৯০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ইতিহাস তৈরি হয়।
প্রথমে অরভিল ১২ সেকেন্ডে ১২০ ফুট উড়েন, আর চতুর্থ চেষ্টায় উইলবার ৫৯ সেকেন্ডে ৮৫২ ফুট অতিক্রম করে প্রমাণ করেন, মানুষ সত্যিই আকাশ জয় করতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯১২ সালে টাইফয়েড জ্বরে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন থেমে থাকেনি। আজকের প্রতিটি উড়োজাহাজ, প্রতিটি আকাশযাত্রা যেন তাঁর সেই স্বপ্নেরই বিস্তৃত ডানা।