মহাকাশের বিশাল শূন্যতায় চাঁদে পৌঁছানো সব সময়ই কঠিন, ব্যয়বহুল এবং জটিল একটি কাজ। পৃথিবী থেকে চাঁদে মহাকাশযান পাঠাতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হয়। তাই বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি পথ খুঁজছিলেন, যাতে কম জ্বালানি ব্যবহার করেই চাঁদে পৌঁছানো যায়। সম্প্রতি সেই চেষ্টায় বড় একটি অগ্রগতির দাবি করেছেন গবেষকেরা। তারা পৃথিবী থেকে চাঁদে যাওয়ার এমন একটি নতুন পথ খুঁজে পেয়েছেন, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী।
ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে অ্যাস্ট্রোডায়নামিকস সাময়িকীতে। বিজ্ঞানীদের মতে, ‘থিওরি অব ফাংশনাল কানেকশনস’ নামে একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে এই নতুন পথ শনাক্ত করা হয়েছে। উন্নত কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে পৃথিবী থেকে চাঁদে যাওয়ার সম্ভাব্য বহু পথ বিশ্লেষণ করা হয়। সেই বিশ্লেষণে দেখা যায়, পৃথিবী ও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আরও সহজ ও কম খরচের পথ তৈরি করা সম্ভব। মহাকাশবিজ্ঞানে ‘ভ্যারিয়েট’ বলতে কোনো নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছানোর স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক গতিপথকে বোঝায়।
এত দিন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, পৃথিবীর কাছের দিক দিয়ে চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, চাঁদের ঠিক বিপরীত দিক দিয়ে প্রবেশ করলে আরও কম জ্বালানি লাগে এবং যাত্রা আরও কার্যকর হয়। ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ভিটর মার্টিনস ডি অলিভেইরা জানিয়েছেন, এই নতুন পথ মহাকাশযানকে আগের তুলনায় বেশি মাধ্যাকর্ষণভিত্তিক চালিকা শক্তি দিতে পারে।
এর ফলে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫৮ দশমিক ৮০ মিটার গতিবেগের সমপরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। অর্থাৎ কম জ্বালানি ব্যবহার করেই মহাকাশযান আরও দক্ষভাবে চাঁদে পৌঁছাতে পারবে। এই নতুন পথের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এতে পৃথিবীর সঙ্গে মহাকাশযানের যোগাযোগ বজায় রাখা সহজ হবে। আগে চাঁদের পেছনের দিকে গেলে অনেক সময় মহাকাশযান সাময়িকভাবে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলত। যেমন আর্টেমিস II মিশনের সময় এমন সমস্যা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু নতুন প্রস্তাবিত পথ ব্যবহার করলে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমে যেতে পারে।
বিজ্ঞানীরা অনেক সময় মহাকাশযান পরিচালনায় জ্বালানির বদলে প্রাকৃতিক মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার করেন। এতে অতিরিক্ত শক্তি খরচ কমে যায়। সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ, উপগ্রহ ও মহাজাগতিক বস্তুর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি এমন পথগুলোকে বলা হয় ইন্টারপ্ল্যানেটারি ট্রান্সপোর্টেশন নেটওয়ার্ক। নতুন এই পথও সেই ধারণারই আরও উন্নত একটি উদাহরণ। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে চাঁদে নিয়মিত অভিযান, মানুষ পাঠানো এবং আরও দূরের মহাকাশ মিশনে এই পথ বড় ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স