
তীব্র গরমের দিনে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি, আইসক্রিম কিংবা ঠান্ডা ফল, এসবের জন্য আমাদের ঘরের ফ্রিজের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, ঘরের কোণে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রয়োজনীয় যন্ত্রটি পরিবেশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। বর্তমান রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনার সাধারণত ভেপার কমপ্রেশন পদ্ধতিতে কাজ করে। এই পদ্ধতিতে একটি বিশেষ তরল পদার্থ চারপাশ থেকে তাপ শোষণ করে গ্যাসে পরিণত হয় এবং পরে আবার সংকুচিত হয়ে তরলে ফিরে আসে। এই চক্র বারবার চলতে থাকে এবং এর মাধ্যমে ভেতরের অংশ ঠান্ডা থাকে। যদিও পদ্ধতিটি কার্যকর, কিন্তু এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ব্যবহৃত রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস। ফ্রিজ ও এসিতে ব্যবহৃত হাইড্রোফ্লুরোকার্বন (HFC) ধরনের গ্যাস পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম বড় কারণ।
এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে বিজ্ঞানীরা নতুন এক প্রযুক্তির সন্ধান পেয়েছেন, যার নাম আয়নোক্যালোরিক কুলিং। এই পদ্ধতি শুধু ঠান্ডা করার নতুন উপায়ই নয়, বরং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকেও একটি বড় পদক্ষেপ। বিজ্ঞান সাময়িকী Science-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে-এর গবেষকেরা ২০২৩ সালে প্রথম এই ধারণা উপস্থাপন করেন। প্রযুক্তিটি মূলত পদার্থের দশা পরিবর্তনের একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
ধরুন, একটি বরফের টুকরো গলতে শুরু করলে সেটি চারপাশ থেকে তাপ শোষণ করে নেয়, ফলে আশপাশের পরিবেশ কিছুটা ঠান্ডা হয়ে যায়। সাধারণত বরফ গলাতে তাপমাত্রা বাড়াতে হয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তাপমাত্রা না বাড়িয়েও বরফ গলানো সম্ভব। শীতপ্রধান দেশে বরফ জমে গেলে রাস্তায় লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। লবণের আয়ন বরফের গলনাঙ্ক কমিয়ে দেয়, ফলে তাপমাত্রা না বাড়িয়েও বরফ গলতে শুরু করে। আয়নোক্যালোরিক কুলিং প্রযুক্তি মূলত এই নীতির ওপরই কাজ করে। এখানে লবণের আয়নের সাহায্যে তরলের দশা পরিবর্তন ঘটানো হয়, যা আশপাশের তাপ শোষণ করে এবং পরিবেশ ঠান্ডা করে।
এই প্রযুক্তি পরীক্ষা করার জন্য বিজ্ঞানীরা আয়োডিন ও সোডিয়াম দিয়ে তৈরি একটি লবণ এবং ইথিলিন কার্বনেট নামের একটি অর্গানিক সলভেন্ট ব্যবহার করেন। ইথিলিন কার্বনেট সাধারণত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতেও ব্যবহৃত হয় এবং এটি তৈরি করতে কার্বন ডাই-অক্সাইড লাগে। অর্থাৎ এই প্রযুক্তি এমন উপাদান ব্যবহার করতে পারে যা তৈরি করতে কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহৃত হয়, ফলে পরিবেশের ওপর চাপও কমে। পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এক ভোল্টেরও কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তাপমাত্রা প্রায় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এত কম শক্তি ব্যবহার করে এত বড় তাপমাত্রা পরিবর্তন আগে কোনো ক্যালোরিক প্রযুক্তিতে দেখা যায়নি।
গবেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতের রেফ্রিজারেশন প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রেফ্রিজারেন্টের গ্লোবাল ওয়ার্মিং পটেনশিয়াল, শক্তির দক্ষতা এবং যন্ত্রপাতির খরচ। আয়নোক্যালোরিক কুলিং এই তিনটি ক্ষেত্রেই আশাব্যঞ্জক ফল দেখাচ্ছে। আন্তর্জাতিক কিগালি সংশোধনী চুক্তি অনুযায়ী আগামী ২৫ বছরের মধ্যে বিশ্বের অনেক দেশ ক্ষতিকর এইচএফসি গ্যাসের ব্যবহার প্রায় ৮০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে আয়নোক্যালোরিক প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণা এখানেই থেমে নেই। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল এই প্রযুক্তির আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করেছে। নতুন এই পদ্ধতিতে নাইট্রেট-ভিত্তিক লবণ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ইলেকট্রিক ফিল্ড এবং বিশেষ মেমব্রেনের সাহায্যে সহজেই পুনর্ব্যবহার করা যায়। ফলে ভবিষ্যতে এটি আরও কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব হতে পারে। বর্তমানে এই প্রযুক্তি গবেষণাগারে সফল হলেও এখনো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসেনি। তবে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। হয়তো কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের ঘরের প্রচলিত ফ্রিজের জায়গা দখল করে নেবে পরিবেশবান্ধব আয়নোক্যালোরিক রেফ্রিজারেটর।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট, বিজ্ঞানচিন্তা
