ধাতুকে সোনায় রূপান্তরের ধারণার সূচনা হয় প্রাচীন গ্রিসে, দার্শনিক প্যানোপোলিসের জোসিমোসের সময় থেকে। তার দৃষ্টিতে এটি ছিল আত্মার শুদ্ধিকরণ ও মুক্তির প্রতীক, যা কেবল একটি রসায়নিক নয় বরং আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়াও বটে। পরে মধ্যযুগীয় ইউরোপে এই ধারণার পুনর্জন্ম ঘটে, তবে এবার তা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ব্যবহারিক: সস্তা ধাতু থেকে সোনা তৈরি মানেই নিশ্চিত ধনসম্পদের পথ।
এই প্রসঙ্গে পর্তুগালের নোভা ইউনিভার্সিটি লিসবনের প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহ্যবিষয়ক বিজ্ঞানী উম্বার্তো ভেরোনেসি বলেন,
“আলকেমিস্টদের বিশ্বাস ছিল, সাধারণ ধাতুগুলো আসলে অপবিত্র এক রূপ, যা ধীরে ধীরে বিশুদ্ধ সোনায় পরিণত হবে। সমস্যা একটাই, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃতিতে সময় লাগে অনেক।”
এই রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে তারা খুঁজছিলেন ‘দার্শনিকের পাথর’ নামক এক পৌরাণিক পদার্থ। তারা বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি ধাতু গঠিত পারদ, সালফার ও লবণের সংমিশ্রণে। সঠিক অনুপাতে এই উপাদানগুলোকে পুনর্বিন্যাস করলে ও অমেধ্যগুলো সরিয়ে ফেললে, ধাতু শেষমেশ সোনায় পরিণত হবে।
ভেরোনেসির মতে,
“ক্রাইসোপোইয়া সেই সময়কার পদার্থ ও রূপান্তরের তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কেউ মনে করত না এটা অসম্ভব।”
তবে ১৭শ ও ১৮শ শতাব্দীতে আধুনিক বিজ্ঞানের আবির্ভাব এই ধারণাকে ধীরে ধীরে ভুল প্রমাণ করে। রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা নতুন পথ দেখাতে শুরু করে, আর আলকেমি পিছনে পড়ে যায়। তবুও, আশ্চর্যজনকভাবে, বিগত এক শতাব্দী ধরে পরমাণুবিদ্যার অগ্রগতির ফলে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ধাতুকে সোনায় রূপান্তর সত্যিই সম্ভব অন্তত তাত্ত্বিকভাবে।
আজ আমরা জানি, একটি মৌল নির্ধারিত হয় তার পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটনের সংখ্যা দিয়ে। যেমন, সোনার পরমাণুতে থাকে ৭৯টি প্রোটন, আর সীসার নিউক্লিয়াসে থাকে ৮২টি। তবে নিউক্লিয়াসের প্রোটন বা নিউট্রন সরানো কঠিন, কারণ সেগুলো শক্তিশালী পারমাণবিক বল দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে বাধা থাকে।
সুইজারল্যান্ডের CERN-এ কর্মরত পদার্থবিদ আলেকজান্ডার কালওয়েট বলেন,
“যথেষ্ট শক্তি থাকলে আপনি মৌলের নিউক্লিয়াস পুনর্বিন্যাস করে এক মৌলকে অন্যটিতে রূপান্তর করতে পারেন। সীসা নিউক্লিয়াস থেকে যদি আপনি তিনটি প্রোটন সরিয়ে ফেলেন, তবে আপনি সোনার নিউক্লিয়াস তৈরি করেন।”
এই রূপান্তরের প্রথম সফল উদাহরণ আসে ১৯৪১ সালে। হার্ভার্ডের বিজ্ঞানীরা লিথিয়াম ও ডিউটেরিয়াম নিউক্লিয়াস দিয়ে পারদের পরমাণুতে আঘাত করেন। এই আঘাতে পারদের নিউক্লিয়াস থেকে কিছু প্রোটন ও নিউট্রন ছিটকে যায় এবং সোনার তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরি হয়। যদিও, তা স্থায়িত্বহীন।
পরবর্তীতে, ১৯৮০-এর দশকে নোবেল বিজয়ী গ্লেন সিবর্গ ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে আরও উন্নত পদ্ধতিতে বিসমাথ পরমাণু ভেঙে কার্বন ও নিয়ন দিয়ে হাজার হাজার পরমাণুকে সোনায় রূপান্তর করেন।
আজও বিশ্বজুড়ে গবেষকরা পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটরের মাধ্যমে এই ধরনের পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে (CERN), কালওয়েটের দল সীসার আয়নের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটিয়ে এমন এক অবস্থা তৈরি করছেন যা বিগ ব্যাং–এর কয়েক মাইক্রোসেকেন্ড পর বিদ্যমান ছিল। এটি হলো কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা।
তিনি ব্যাখ্যা করেন,
“এই সংঘর্ষে প্রোটন ও নিউট্রন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। তবে কিছু নিম্ন-শক্তির মিথস্ক্রিয়ায় এমন চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা সীসার নিউক্লিয়াস থেকে প্রোটন আলাদা করে দেয়। ফলে তৈরি হয় সামান্য পরিমাণ সোনা।”
তিন বছর ধরে চালানো এই পরীক্ষায় প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ সোনা তৈরি হয়েছিল। তবে এই সাফল্য সত্ত্বেও, বাস্তবে এটি অর্থনৈতিকভাবে মোটেও লাভজনক নয়। বিশাল ব্যয়ে নির্মিত অ্যাক্সিলারেটর ও অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়ার তুলনায় উৎপাদিত সোনার পরিমাণ তুচ্ছ।
কালওয়েট বলেন,
“১৯৪০ সাল থেকে অনেকবার সোনা উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটা এত ব্যয়সাপেক্ষ ছিল যে, কোনোটিই কখনো বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হয়নি।”
সুতরাং, যদিও আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে ধাতুকে সোনায় রূপান্তর তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব, কিন্তু সেটি এখনও রয়ে গেছে একটি প্রযুক্তিগত বিস্ময় বাস্তবিক প্রয়োগ নয়। আলকেমিস্টদের স্বপ্ন সত্য হলেও, তা কখনোই সাধারণ মানুষের ধনসম্পদের উৎস হয়ে উঠতে পারবে না।
Leave a Reply