পৃথিবীর বিশাল পর্বতমালা, ভয়ংকর ভূমিকম্প, আর মহাদেশগুলোর ধীরে ধীরে সরে যাওয়া, সব কিছুর নেপথ্যে কাজ করছে আমাদের পায়ের অনেক নিচে থাকা টেকটোনিক প্লেটগুলো। যেন এক বিশাল, অদৃশ্য যন্ত্র, যা নিরবেই পৃথিবীর চেহারা বদলে দিচ্ছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের জানা মতে সৌরজগতের আর কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে এমন সক্রিয় ও সুগঠিত টেকটোনিক প্লেট নেই। তাহলে কেন শুধু পৃথিবীতেই এই বিশেষ ব্যবস্থা কাজ করছে? কেন এটি অন্য গ্রহগুলোর থেকে আলাদা?
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির জিওডায়নামিসিস্ট ব্র্যাডফোর্ড ফোলির মতে, এই প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর এখনো অজানা। বরং এটি আধুনিক ভূপ্রকৃতিবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি।
টেকটোনিক প্লেট আসলে কী?
পৃথিবীর শক্ত বাইরের আবরণ এবং তার নিচের ম্যান্টলের উপরের অংশ মিলিয়ে গঠিত হয় লিথোস্ফিয়ার। তবে এটি কোনো একটানা স্তর নয়। বরং ভাঙা জিগস পাজলের মতো প্রায় ১৫টি বড় টুকরোয় বিভক্ত। এই টুকরোগুলোই টেকটোনিক প্লেট।
এই প্লেটগুলো কখনো একে অপরের দিকে এগিয়ে যায়, কখনো ধাক্কা খায়, আবার কখনো দূরে সরে যায়। কীভাবে বা কেন এই প্লেটগুলো প্রথমে ভেঙে তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তবে পৃথিবীর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য এগুলোকে এখনো সচল রেখেছে।
পানিই পৃথিবীর গোপন শক্তি
পৃথিবীতে প্লেট টেকটোনিক্স সচল থাকার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো তরল পানি। টরন্টো ইউনিভার্সিটির জিওফিজিসিস্ট রাসেল পিসক্লিওয়েক ব্যাখ্যা করেছেন, যখন দুটি প্লেট সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং একটি অন্যটির নিচে ঢুকে যায়, তখন সমুদ্রের পানি সেই পাথরের সঙ্গে নিচে প্রবেশ করে।
আরো পড়ুন: আকাশে বজ্রপাত কেন হয়?
এই পানি পাথরের মাঝে এক ধরনের পিচ্ছিলকারক হিসেবে কাজ করে, ফলে প্লেটগুলো সহজে একে অপরের ওপর দিয়ে বা নিচ দিয়ে সরে যেতে পারে। অর্থাৎ, পানি যেন পৃথিবীর অভ্যন্তরে একটি অদৃশ্য লুব্রিকেন্ট, যা পুরো প্রক্রিয়াকে সচল রাখে।
অন্য গ্রহে কী ঘটে?
উদাহরণ হিসেবে মঙ্গল গ্রহকে ধরা যায়। মঙ্গলের ভেতরেও উত্তপ্ত ম্যান্টলের নড়াচড়া রয়েছে, কিন্তু এর ওপরের ভূত্বক পৃথিবীর মতো ভাঙা নয়। বরং এটি একটি অখণ্ড স্তর, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন “স্ট্যাগন্যান্ট লিড”। অর্থাৎ, পুরো গ্রহটি যেন একটি শক্ত ঢাকনা দিয়ে ঢাকা, যা ভাঙে না, সরে না।
ইউরোপা: ব্যতিক্রমের আভাস
পৃথিবীর বাইরে টেকটোনিক প্লেটের সবচেয়ে কাছাকাছি উদাহরণ পাওয়া যায় বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপায়। ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপার বরফের খোলসের কিছু অংশ ভেঙে প্লেটের মতো আচরণ করেছে এবং একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে।
তবে এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর মতো নয়। ইউরোপার বরফের প্লেটগুলো পানিতে ভাসমান, কিন্তু এগুলো পৃথিবীর পাথরের প্লেটের মতো ভারী হয়ে নিচে ডুবে যেতে পারে না। ফলে সেখানে টেকটোনিক কার্যকলাপ সীমিত, বিচ্ছিন্ন এবং অনিয়মিত।
বিজ্ঞানী ফোলির মতে, এই রহস্য সমাধানের সবচেয়ে বড় বাধা হলো তুলনার অভাব। সৌরজগতে পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ যেখানে সক্রিয় প্লেট টেকটোনিক্স দেখা যায়। যদি আমাদের কাছে পৃথিবীর মতো আরও অনেক গ্রহ থাকত, তাহলে হয়তো আমরা সহজেই বুঝতে পারতাম কোন শর্তগুলো একটি গ্রহকে এমন গতিশীল করে তোলে। ততদিন পর্যন্ত, পৃথিবী রয়ে গেছে এক অনন্য গ্রহ যার ভেতরে লুকিয়ে আছে চলমান এক জটিল ও বিস্ময়কর জগত।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স