জলবায়ু বিজ্ঞানীরা একটি বৈশ্বিক জলবায়ু দূষণ ডেটাবেসে বড় ধরনের ত্রুটি খুঁজে পেয়েছেন। সাবেক মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি আল গোর-এর সহ-প্রতিষ্ঠিত ক্লাইমেট ট্রেস (জলবায়ু ট্রেস) কনসোর্টিয়ামের তৈরি বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ডেটাবেস শহরগুলোর যানবাহনজনিত কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনকে গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ কম দেখাচ্ছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
স্বতন্ত্র শহরাঞ্চলের স্কেলে ২০২১ সালের ভলকান এবং ক্লাইমেট ট্রেস-এর শহুরে সড়কপথে FFCO₂ নির্গমনের তুলনায় সিটি সংস্করণ ১, সিটি সংস্করণ ২ এবং স্কেলবিহীন ক্লাইমেট ট্রেস সংস্করণ ২ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে ভলকান FFCO₂-এর ৯৫ শতাংশ CI মান, রৈখিক রিগ্রেশন সমীকরণ ও ফিট, R²-এর মান এবং ১:১ রেখাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। নর্দার্ন অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এই গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লাইমেট ট্রেস ডেটাবেস শহরাঞ্চলের যানবাহনের নির্গমন পরিমাপে বড় ধরনের অসঙ্গতি তৈরি করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ইনফরমেটিক্স, কম্পিউটিং অ্যান্ড সাইবার সিস্টেমসের অধ্যাপক কেভিন গার্নি সম্প্রতি প্রকাশিত ক্লাইমেট ট্রেস ডেটাবেস থেকে গাড়ি ও ট্রাকের CO₂ নির্গমন বিশ্লেষণ করে ফলাফল প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কিত পূর্ববর্তী গবেষণাতেও একই ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়েছিল, যা জলবায়ু নীতির জন্য উদ্বেগজনক।
শহরাঞ্চলে যানবাহনের কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁরা ক্লাইমেট ট্রেস ডেটা সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করেছেন। তাঁর মতে, নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পদ্ধতি সম্ভাবনাময় হলেও এই ডেটা যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর নগর CO₂ নির্গমনের অর্ধেকেরও বেশি পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখাচ্ছে। গার্নি ও তাঁর দল ক্লাইমেট ট্রেস-এর শহুরে যানবাহন CO₂ নির্গমন তথ্যের সঙ্গে তাঁদের গবেষণাগারে তৈরি ‘ভলকান’ ডেটাবেসের তুলনা করেন। ভলকান সরকারি ট্র্যাফিক ও জ্বালানি ব্যবহারের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি একটি নির্ভরযোগ্য অনরোড নির্গমন ডেটাবেস।
গবেষণার সহ-তদন্তকারী বিলাল আসলাম বলেন, ভলকান ডেটাবেসেও প্রায় ১৪ শতাংশ অনিশ্চয়তা রয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ২৬০টি শহরের নির্গমন তথ্যের সঙ্গে তুলনা করলে ক্লাইমেট ট্রেস-এর পার্থক্য অনেক বেশি ছিল। তাঁর মতে, ক্লাইমেট ট্রেস ডেটাবেসের নির্গমন তথ্য গড়ে ভলকানের তুলনায় ৭০ শতাংশ কম।গবেষণার আরেক অবদানকারী পাওলোক দাস জানান, ইন্ডিয়ানাপোলিস এবং ন্যাশভিলের মতো শহরগুলোতে এই পার্থক্য ৯০ শতাংশেরও বেশি ছিল। গবেষকরা সন্দেহ করছেন, এই কম হিসাব কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও থাকতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক কঠোরতা, স্বচ্ছতা এবং বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা অপরিহার্য। কারণ সঠিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন মূল্যায়ন কার্যকর জলবায়ু নীতির ভিত্তি।গবেষণাপত্রে ক্লাইমেট ট্রেস-এর কার্যক্রম আরও উন্নত করার জন্য বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে, যাতে নির্গমন কমানোর নীতি ও বাজেট নির্ধারণে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
গার্নি বলেন, “আমরা হয়তো কখনোই শতভাগ নিখুঁত নির্গমন হিসাব করতে পারব না। তবে নীতিনির্ধারক ও জনগণের কাছে যে তথ্য উপস্থাপন করা হবে, তা অবশ্যই পক্ষপাতহীন এবং সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুসরণকারী হতে হবে। অন্যথায় নীতিনির্ধারকেরা বিভ্রান্ত হবেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।” বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান, বাস্তুবিদ্যা ও জননীতির বিশেষজ্ঞ গার্নি গত দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন পরিমাপের একটি প্রমিত ব্যবস্থা তৈরিতে কাজ করছেন। তাঁর ভলকান ও হেস্তিয়া প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলাকা ও সড়কপথভিত্তিক নির্গমন পরিমাপ ও দৃশ্যমান করে। এর মাধ্যমে নির্গমন ‘হটস্পট’ শনাক্ত করা এবং কোথায় সবচেয়ে কার্যকরভাবে নির্গমন কমানো সম্ভব, সে বিষয়ে উন্নত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।