ক্রান্তীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলে কিছু ঝড় মেঘ ও বৃষ্টির এক বিশৃঙ্খল গোলযোগ হিসেবে শুরু হয়। কিন্তু অনুকূল পরিস্থিতিতে এগুলো ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে, যা সমগ্র ভূদৃশ্য পরিবর্তন করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তায় কিছু নির্দিষ্ট পরিভাষা বারবার শোনা যায়। কখনও বলা হয় ক্রান্তীয় ঝড়, কখনও বা ঘূর্ণিঝড় বা হারিকেন। এগুলো আলাদা কোনো ঘটনা নয়, বরং একই বায়ুমণ্ডলীয় কাহিনির ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়।
ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আটলান্টিক মহাসাগরে সৃষ্ট ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়গুলোর প্রায় ৬৬ শতাংশ হারিকেনে পরিণত হয়নি। প্রতি দুইটির মধ্যে প্রায় একটি কেবলমাত্র ক্রান্তীয় ঝড়ের সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছেছিল। ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় হলো একটি নিম্নচাপ ব্যবস্থা, যার বৈশিষ্ট্য সুসংগঠিত ঝড় ও বাতাস। এটি একটি কেন্দ্রকে ঘিরে উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরে। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ই ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণ জলের ওপর নিজের শক্তি সঞ্চয় করে। ঘূর্ণিঝড়ের বিকাশের বিভিন্ন ধাপ রয়েছে, যা মূলত বাতাসের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে। সেই অনুযায়ী এর গঠন ও বিন্যাসও বদলে যায়। তবে অনেক সময় শুধু বাতাসের শক্তিই নয়, কত বৃষ্টি হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে এবং কতক্ষণ ধরে হচ্ছে, সেটিও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি হারিকেনই একসময় ক্রান্তীয় ঝড় ছিল।
অন্যান্য প্রাকৃতিক ঘটনার মতো ঘূর্ণিঝড়েরও একটি জীবনচক্র রয়েছে। এদের জন্ম হয়, এরা বেড়ে ওঠে, বিকশিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিলীন হয়ে যায়। আর এই পুরো যাত্রায় মহাসাগরই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। একটি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের জন্ম হয় অত্যন্ত উষ্ণ সমুদ্রজলের ওপর। সাধারণত ৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত পানির তাপমাত্রা কমপক্ষে ২৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকতে হয়। এই উষ্ণ জল বাষ্পীভূত হয়ে আর্দ্র বাতাস তৈরি করে। সেই বাতাস ওপরে উঠতে থাকলে ঝড় সৃষ্টি হয় এবং তাপ নির্গত করে, যা নিম্নচাপ অঞ্চলকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। যদি বায়ুমণ্ডলে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকে এবং উচ্চতার সঙ্গে বাতাসের পরিবর্তন খুব কম হয়, তবে সিস্টেমটি ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে শুরু করে।
সঞ্চালন শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি ক্রান্তীয় গোলযোগ থেকে ক্রান্তীয় নিম্নচাপ, তারপর ক্রান্তীয় ঝড় এবং শেষ পর্যন্ত হারিকেনে পরিণত হতে পারে। তবে সব ঘূর্ণিঝড় সেই পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করতে পারে না। বেশিরভাগই তাদের সবচেয়ে তীব্র অবস্থায় পৌঁছানোর আগেই দুর্বল হয়ে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর জন্য একটি ঝড়ের হারিকেন হওয়া জরুরি নয়। ক্রান্তীয় নিম্নচাপ, ক্রান্তীয় ঝড় এবং হারিকেনের পার্থক্য নির্ধারণ করা হয় সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতিবেগ দিয়ে। এখানে ‘স্থায়ী’ বলতে ক্ষণস্থায়ী দমকা বাতাস নয়, বরং সাধারণত এক মিনিট সময়ের গড় বাতাসের গতি বোঝানো হয়।
বর্তমানে বহুল পরিচিত স্যাফির-সিম্পসন স্কেল কেবল হারিকেনকে শ্রেণিবদ্ধ করে। অর্থাৎ যেসব ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতি ঘণ্টায় ১১৯ কিলোমিটার বা তার বেশি হয়, সেগুলোই হারিকেন হিসেবে গণ্য হয়। এর নিচে বাতাসের গতির ভিত্তিতে সাধারণ শ্রেণিবিন্যাস ব্যবহৃত হয়। যদি কোনো ঘূর্ণিঝড়ে বদ্ধ সঞ্চালন থাকে এবং সর্বোচ্চ একটানা বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৬৩ কিলোমিটারের কম হয়, তবে সেটিকে ক্রান্তীয় নিম্নচাপ বলা হয়। বাতাসের গতি ৬৩ থেকে ১১৮ কিলোমিটারের মধ্যে হলে সেটি ক্রান্তীয় ঝড় হিসেবে পরিচিত হয়। আর বাতাসের গতি ঘণ্টায় ১১৯ কিলোমিটার অতিক্রম করলে তা হারিকেনে পরিণত হয়। তবে শুধু বাতাসের তীব্রতাই নয়, একটি ঘূর্ণিঝড়ের অভ্যন্তরীণ কাঠামোও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।
ক্রান্তীয় ঝড়ের কেন্দ্রে সাধারণত বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি ও বজ্রঝড় দেখা যায়। কিন্তু এটি হারিকেনে রূপ নিলে ঘূর্ণন আরও প্রতিসম ও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। তখনই গঠিত হয় এর বিখ্যাত ‘চোখ’ বা কেন্দ্র। এই কেন্দ্র তুলনামূলক শান্ত একটি অঞ্চল, যার চারপাশে থাকে সবচেয়ে শক্তিশালী বাতাসের বলয়, যাকে আইওয়াল বলা হয়। স্যাটেলাইট চিত্রে এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। একটি অনিয়মিত মেঘপুঞ্জ ধীরে ধীরে সুসংগঠিত ও স্পষ্ট কাঠামোতে রূপ নেয়। যদিও হারিকেন ঘূর্ণিঝড়ের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়, তার মানে এই নয় যে ক্রান্তীয় ঝড় নিরাপদ। হারিকেনের শক্তি অর্জন না করেও এসব ঝড় মারাত্মক বন্যা, ভূমিধস, উঁচু ঢেউ এবং প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে। সিস্টেমটি যত শক্তি সঞ্চয় করে, ততই এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা বাড়ে, বিশেষ করে বাতাস ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে। তবে ইতিহাসে অনেক বিধ্বংসী ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় রয়েছে, যেগুলো কখনও হারিকেনে পরিণতই হয়নি। বৃষ্টিপাত এবং ঝড়ের অগ্রগতির গতি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২০২০ সালের ক্রিস্টোবাল তার একটি উদাহরণ। এটি প্রথমে ক্রান্তীয় ঝড় এবং পরে নিম্নচাপে পরিণত হলেও দক্ষিণ-পূর্ব মেক্সিকোতে ব্যাপক বৃষ্টিপাত ও বন্যা সৃষ্টি করেছিল। ফলে কোনো সিস্টেম হারিকেন নয় বলেই যে তা কম ক্ষতিকর হবে, এমন ধারণা ভুল। প্রায়শই একটি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব আসে বাতাস থেকে নয়, বরং পানি থেকে। টানা বৃষ্টি, নদীর পানি উপচে পড়া, ভূমিধস এবং আকস্মিক বন্যাই হয়ে ওঠে প্রধান বিপদ। তাই একটি ক্রান্তীয় নিম্নচাপ বা ক্রান্তীয় ঝড় তীব্রতার মাপকাঠিতে কম হলেও মানুষের জন্য তা মোটেও কম বিপজ্জনক নয়।
সূত্র: এনএইচসি, ২০২৬। স্যাফির-সিম্পসন হারিকেন বায়ু স্কেল।