প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে বিশাল উষ্ণ পানির একটি ঢেউ পূর্ব দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনো (এল নিনো কি সেটা ভিতরে আলোচনা করা হয়েছে) শুরু হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে। নাসা ও ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষকদের স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। সমুদ্রের পানি গরম হলে তা প্রসারিত হয়। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ কিছুটা উঁচু হয়ে যায়।
স্যাটেলাইট থেকে দেখা গেছে, দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির উচ্চতা বেড়েছে। এর মানে সেখানে উষ্ণ পানি জমা হচ্ছে। এই উষ্ণ জলের ঢেউকে বিজ্ঞানীরা “কেলভিন তরঙ্গ” বলেন। এটি সাধারণত এল নিনো শুরু হওয়ার আগে দেখা যায়। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে এই তরঙ্গ তৈরি হয় এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে।২০২৬ সালের স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, মার্চে তৈরি হওয়া একটি শক্তিশালী কেলভিন তরঙ্গ মে মাসে পেরু উপকূলে পৌঁছেছে। সে সময় ওই অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার বেশি ছিল।
এল নিনো কি?
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা। সাধারণ সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের পানি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় থাকে। কিন্তু কিছু বছর পরপর সেই পানি অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে যায়। তখনই তাকে এল নিনো বলা হয়। এর প্রভাবে যেমন: কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যা, কোথাও খরা ও পানির সংকট, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, ঝড়ের ধরনে পরিবর্তন, কৃষি ও মাছ ধরায় প্রভাব। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পরোক্ষভাবে পড়তে পারে।
এটি পৃথিবীর আবহাওয়ার ওপর বড় প্রভাব ফেলে। এর কারণে কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যা হতে পারে। আবার কোথাও খরা, তাপপ্রবাহ ও পানির সংকট দেখা দিতে পারে। কৃষি, মৎস্য, বাণিজ্য ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়ে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাঝারি মাত্রার এল নিনো সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বেশি প্রভাব ফেলে।
কিন্তু শক্তিশালী এল নিনো হলে এর প্রভাব আরও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। যেমন আফ্রিকায় খরা, দক্ষিণ আমেরিকায় ভারী বৃষ্টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে বন্যা পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। “এল নিনো” নামটি এসেছে স্প্যানিশ ভাষা থেকে। এর অর্থ “ছোট ছেলে”। ১৬০০-এর দশকে জেলেরা এই নাম দিয়েছিলেন, কারণ বড়দিনের সময় এর প্রভাব বেশি দেখা যেত। তখন সমুদ্রের পানি উষ্ণ হয়ে যাওয়ায় মাছের পরিমাণ কমে যেত। নাসার সেন্টিনেল-৬ মাইকেল ফ্রেইলিখ স্যাটেলাইট প্রতি ১০ দিন পরপর পুরো পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মাপতে পারে।
এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তন, কেলভিন তরঙ্গের গতি এবং এল নিনোর সম্ভাব্য বিকাশ নজরে রাখছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি এল নিনো আলাদা। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এটি পৃথিবীতে উষ্ণ বছর, বৃষ্টিপাতের বড় পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এল নিনো সাধারণত নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়। তাই এর পুরো প্রভাব দেখতে আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।