বোস, আইনস্টাইন ও কোয়ান্টাম স্পিনের গল্প

বোস, আইনস্টাইন ও কোয়ান্টাম স্পিনের গল্প

কোয়ান্টাম স্পিন

Hossain Hawlader
লেখকঃ Hossain Hawlader
4 মিনিট পড়তে লাগবে

বিশ শতকের একেবারে গোড়ায় পদার্থবিজ্ঞানের আকাশে যেন অদ্ভুত এক অস্বস্তি ভাসছিল। আলো, তাপ আর বিকিরণের আচরণ। সবকিছুই তখন পর্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করছিল বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তত্ত্ব। কিন্তু হঠাৎ করেই এক রহস্য এসে সব গুলিয়ে দিল: কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে ১৯০০ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক এমন এক ধারণা হাজির করলেন, যা বিজ্ঞানের পথটাই বদলে দিল, কোয়ান্টাম তত্ত্ব।

প্ল্যাঙ্ক বললেন, শক্তি কোনো অবিচ্ছিন্ন ধারা নয়; বরং ছোট ছোট প্যাকেটে বিন্যস্ত। পরে আলবার্ট আইনস্টাইন এই শক্তির প্যাকেটগুলোর নাম দেন “কোয়ান্টা”, যা পরবর্তীতে “ফোটন” নামে পরিচিত হয়। এই ধারণা আলোর আচরণ বোঝার নতুন দরজা খুলে দেয়, বিশেষ করে আলোক তড়িৎক্রিয়ার ব্যাখ্যায়।

কোয়ান্টাম স্পিন
ছবির সৌজন্যে: ভিঙ্ক ফ্যান/শাটারস্টক

তবু সমস্যার শেষ হয়নি। প্ল্যাঙ্কের সমীকরণে এক অদ্ভুত দ্বৈততা রয়ে গেল। আলোকে একদিকে কণা হিসেবে ধরা হচ্ছে, অন্যদিকে আবার তরঙ্গের ছায়াও লেগে আছে। এই অমিলটা অনেকের চোখ এড়িয়ে গেলেও এড়িয়ে যায়নি ঢাকার এক তরুণ অধ্যাপকের। তিনি সত্যেন্দ্রনাথ বসু ১৯২৪ সালে বোস প্ল্যাঙ্কের সূত্রকে নতুনভাবে সাজালেন। তিনি আলোকে পুরোপুরি কণার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলেন, যেখানে তরঙ্গের কোনো প্রয়োজনই রইল না। কিন্তু তাঁর গবেষণাপত্র প্রথমে প্রকাশ পায়নি। পরে তিনি সেটা পাঠালেন আইনস্টাইনের কাছে। আইনস্টাইন দ্রুত বুঝলেন এর গুরুত্ব, নিজে অনুবাদ করে জার্মান জার্নালে প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন। এই কাজ থেকেই জন্ম নেয় “বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান” যা আজ কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তির একটি স্তম্ভ। কিন্তু গল্প এখানেই থেমে থাকেনি।

আরো পড়ুন: গাড়ির ব্যাটারিতে পানি দেওয়া হয় কেন?

বোস তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধে আলোর কণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করেন। সেখানে তিনি একটি গুণক ব্যবহার করেছিলেন, সংখ্যা ২। এই “২”-এর পেছনে ছিল আলোর পোলারাইজেশন বা আরও গভীরভাবে বললে, এমন এক ধারণার ইঙ্গিত যা পরে “স্পিন” নামে পরিচিত হয়। কিন্তু আইনস্টাইন এই অংশটি গ্রহণ করেননি। তাঁর মন্তব্যসহ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হলেও তা তেমন সাড়া ফেলেনি। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ছিল গভীর। অনেকের মতে, এই একটি মন্তব্যই বোসের দ্বিতীয় কাজটিকে আড়ালে ঠেলে দেয়।

আলোর পোলারাইজেশন বোঝাতে গেলে বিষয়টা একটু কল্পনায় আনা যায়। ভাবো, আলো শুধু একভাবে কাঁপে না। তার ভেতরে আছে দুই দিকের কম্পন, যেন অদৃশ্য দুই সুর একসাথে বাজছে। এই দুই সম্ভাবনার দিকই পরে স্পিন ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়। আধুনিক ভাষায় বললে, একটি ফোটন তার চলার দিক বরাবর ঘড়ির কাঁটার মতো বা উল্টো দিকে ঘুরতে পারে। বোস হয়তো এই ধারণার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁর ছাত্র পার্থ ঘোষ পরে দাবি করেন, বোস আসলে স্পিনের ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি সেভাবে স্বীকৃতি পায়নি।

এদিকে নীলস্ বোর পরমাণুর গঠন ব্যাখ্যায় কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করে নতুন দিগন্ত খুলে দেন। ধীরে ধীরে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বে রূপ নিতে থাকে, যেখানে কণার অদ্ভুত সব আচরণ সম্ভাবনা, অনিশ্চয়তা, স্পিন সবকিছু জায়গা করে নেয়। বোসের মূল প্রবন্ধের আসল রূপ আজ আর হাতে নেই। ইতিহাস যেন ইচ্ছে করেই কিছু অংশ আড়াল করে রেখেছে। তবু বিভিন্ন গবেষণা ও দলিল ঘেঁটে অনেকেই মনে করেন, বোস সত্যিই স্পিন ধারণার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন।

বিজ্ঞানের ইতিহাস এমনই, কখনো আলো ঝলমলে, কখনো ছায়ায় ঢাকা। কে প্রথম দেখেছিল, কে পরে বুঝেছিল‌ এই প্রশ্নগুলো সব সময় পরিষ্কার হয় না। কিন্তু প্রতিটি ধারণা, প্রতিটি চিন্তা মিলেই গড়ে ওঠে জ্ঞানের এই বিশাল জগৎ। আর সেই জগতে সত্যেন্দ্রনাথ বসু নামটি এক অদ্ভুত নীরব দীপ্তি নিয়ে জ্বলতে থাকে। যেন আলো নিজেই, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও অনেক অদেখা কম্পন।

সূত্রঃ বিজ্ঞানচিন্তা.কম

শেয়ার করুন
লেখকঃHossain Hawlader
অনুসরণ করুন
আমি হোসাইন হাওলাদার। আমি mehrab360.com এ একজন সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। আমি সরকারি ব্রজলাল কলেজ, খুলনা এর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ইমেইল: [email protected]
মন্তব্য করুন