বায়ুমণ্ডল না থাকলে আকাশ কেমন দেখাতো?
এআই দিয়ে তৈরি

পৃথিবীর আকাশ আজ যে নীল, কোমল এবং প্রাণবন্ত রঙের চাদরে মোড়ানো, তা আসলে বায়ুমণ্ডলের এক অসাধারণ উপহার। কিন্তু যদি হঠাৎ করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে যেত, তাহলে আকাশের চেহারা এমন হতো যা আমাদের পরিচিত আকাশের সঙ্গে একেবারেই মেলে না।

{inAds}

তখন আকাশ আর নীল থাকত না, বরং হয়ে উঠত এক গভীর, অসীম, ভয়ংকর কালো শূন্যতা, যেন কেউ মহাবিশ্বের দরজা খুলে দিয়েছে এবং তার ভেতরের অন্ধকার সরাসরি আমাদের চোখে ঢেলে দিয়েছে। বর্তমানে আমরা যে নীল আকাশ দেখি, তার কারণ হলো সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলের অণু এবং কণার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে বিজ্ঞানীরা Rayleigh scattering বলেন। এই প্রক্রিয়ায় নীল আলো বেশি ছড়িয়ে পড়ে, তাই আমাদের চোখে আকাশ নীল দেখায়।

{inAds}

কিন্তু বায়ুমণ্ডল না থাকলে সূর্যের আলো আর ছড়িয়ে পড়ত না, বরং সরাসরি সোজা পথে চলত, ফলে আকাশে কোনো নীল রঙের অস্তিত্বই থাকত না। তখন দিনের বেলাতেও আকাশ হতো রাতের মতো কালো, এবং সূর্যকে দেখা যেত একটি তীব্র উজ্জ্বল গোলকের মতো, যার চারপাশে কোনো নীল আভা বা আলো ছড়ানো থাকত না, যেন কালো মখমলের ওপর জ্বলন্ত আগুনের একটি ছিদ্র। এমনকি দিনের বেলাতেও আমরা অসংখ্য তারা দেখতে পেতাম, যা এখন কেবল রাতেই দেখা যায়।

{inAds}

এর কারণ হলো বর্তমানে দিনের বেলায় সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে আকাশকে এত উজ্জ্বল করে তোলে যে দূরের তারাগুলোর ক্ষীণ আলো আমাদের চোখে পৌঁছাতে পারে না, কিন্তু বায়ুমণ্ডল না থাকলে এই ছড়ানো আলো থাকত না, ফলে তারাগুলো সবসময় দৃশ্যমান থাকত। এই দৃশ্যটা অনেকটা সেই রকম, যেমন মহাকাশচারীরা মহাকাশে দেখেন। উদাহরণস্বরূপ, NASA-এর মহাকাশচারীরা যখন মহাকাশে যান, তারা দিনের বেলাতেও কালো আকাশে তারা দেখতে পান, কারণ সেখানে বায়ুমণ্ডল নেই। একই অভিজ্ঞতা হয় International Space Station-এ অবস্থানরত মহাকাশচারীদের, যারা পৃথিবীর দিকে তাকালে নীল বায়ুমণ্ডলের পাতলা স্তর দেখতে পান, কিন্তু তার বাইরে আকাশ থাকে সম্পূর্ণ কালো।

{inAds}

এমনকি চাঁদে অবতরণকারী প্রথম মানুষ Neil Armstrong-ও বলেছিলেন যে চাঁদের আকাশ ছিল সম্পূর্ণ কালো, যদিও সূর্য তখন উজ্জ্বলভাবে জ্বলছিল। বায়ুমণ্ডল না থাকলে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সৌন্দর্যও হারিয়ে যেত। বর্তমানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় আকাশে লাল, কমলা, গোলাপি এবং বেগুনি রঙের অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায়, কারণ সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এবং বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ভিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বায়ুমণ্ডল না থাকলে সূর্য হঠাৎ করে দিগন্তের ওপরে উঠে আসত এবং হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যেত, কোনো রঙের পরিবর্তন বা ধীরে ধীরে আলো কমে যাওয়ার দৃশ্য থাকত না। আকাশ হতো সবসময় একই রকম কালো, শুধু সূর্যের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি অনুযায়ী আলো বা অন্ধকার হতো।

{inAds}

মেঘ, রংধনু, বজ্রপাত, কুয়াশা বা বৃষ্টি কিছুই থাকত না, কারণ এসবই বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প এবং কণার ওপর নির্ভরশীল। আকাশ হতো সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, কোনো কিছুর দ্বারা বাধাগ্রস্ত নয়, ফলে দূরের মহাজাগতিক বস্তু আরও পরিষ্কারভাবে দেখা যেত। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি প্রতিদিন দৃশ্যমান থাকত, এবং আকাশে ছড়িয়ে থাকা তারার সংখ্যা আমাদের বিস্মিত করে তুলত। কিন্তু এই দৃশ্য যতই সুন্দর হোক, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকত ভয়ংকর বাস্তবতা। বায়ুমণ্ডল না থাকলে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি, এক্স-রে এবং মহাজাগতিক বিকিরণ সরাসরি পৃথিবীর পৃষ্ঠে এসে পৌঁছাত, যা জীবনের জন্য মারাত্মক হতো। আকাশের কালো সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকত প্রাণঘাতী বিকিরণের ঝড়। এছাড়া বায়ুমণ্ডল না থাকলে উল্কাপিণ্ডগুলো সহজেই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আঘাত করত, কারণ বর্তমানে বায়ুমণ্ডল অনেক ছোট উল্কাপিণ্ডকে ঘর্ষণের মাধ্যমে পুড়িয়ে ফেলে এবং আমাদের রক্ষা করে।

{inAds}

তখন আকাশে মাঝে মাঝে আগুনের রেখা দেখা যেত, কিন্তু সেগুলো থেমে না গিয়ে সরাসরি মাটিতে আঘাত করত। আরেকটি বড় পরিবর্তন হতো আকাশের গভীরতার অনুভূতিতে। বর্তমানে বায়ুমণ্ডল সূর্যের আলো ছড়িয়ে দিয়ে আকাশকে একটি উজ্জ্বল পটভূমি তৈরি করে, যা আমাদের চোখকে একটি নরম পরিবেশ দেয়। কিন্তু বায়ুমণ্ডল ছাড়া আকাশ হতো একেবারে গভীর, তীক্ষ্ণ এবং সীমাহীন কালো, যেন এক অন্তহীন খাদ, যা আমাদের অস্তিত্বের ক্ষুদ্রতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলত। তখন পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে তাকালে মনে হতো আমরা সরাসরি মহাবিশ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, কোনো সুরক্ষামূলক স্তর ছাড়াই। আকাশ হতো এক বিশাল জানালা, যার ওপারে মহাবিশ্বের অসীম রহস্য উন্মুক্ত হয়ে থাকত। তবে এই আকাশের সৌন্দর্য হতো নিঃসঙ্গ, নীরব এবং কঠোর, যেখানে কোনো পাখির উড়ান থাকত না, কোনো মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াত না, কোনো বাতাসের স্রোত থাকত না।

{inAds}

আকাশ হতো স্থির, অনড় এবং নির্জীব, যেন সময় সেখানে থেমে গেছে। এই দৃশ্য আমাদের কাছে একই সঙ্গে বিস্ময়কর এবং ভীতিকর মনে হতো, কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দিত যে বায়ুমণ্ডল শুধু আকাশকে নীল করে না, বরং আমাদের জীবনকেও রক্ষা করে। তাই বলা যায়, যদি বায়ুমণ্ডল না থাকত, তাহলে আকাশ হতো চিরকালীন কালো, দিনের বেলাতেও তারায় ভরা, সূর্য হতো তীব্র উজ্জ্বল কিন্তু একাকী, এবং পৃথিবী হতো মহাবিশ্বের কঠিন বাস্তবতার সামনে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, যেখানে আকাশের সৌন্দর্য থাকত, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকত জীবনের অনুপস্থিতির নিঃশব্দ ঘোষণা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *