প্রায় ৪০ বছরের অপেক্ষার পর প্রযুক্তি অবশেষে এমন এক নতুন জিপার নকশাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে “থ্রি-সাইডেড” বা তিন দিকের জিপার। ১৯৮৫ সালে এক বিজ্ঞাপনের অনুপ্রেরণায় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার উইলিয়াম ফ্রিম্যান একটি অভিনব ধারণা দেন, যেখানে সাধারণ প্যান্ট বা জ্যাকেট বন্ধ করার বদলে জিপারটি বস্তুগুলোর গঠনই বদলে দিতে পারে, যেমন চেয়ার, তাঁবু বা ব্যাগকে নরম অবস্থা থেকে শক্ত অবস্থায় রূপান্তর করা; তার নকশাটি ছিল ত্রিভুজাকৃতির, যেখানে তিনটি পাশে কাঠের দাঁতের মতো অংশ যুক্ত করে একটি স্লাইডারের মাধ্যমে পুরো কাঠামোকে একটি শক্ত নলাকার রূপে রূপান্তর করা যেত, যদিও তখন তার প্রস্তাবটি বাতিল হয়, তিনি পেটেন্ট করে সেটি সংরক্ষণ করে রাখেন ভবিষ্যতের আশায়।
প্রায় চার দশক পর এমআইটি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ল্যাবরেটরির গবেষকরা এই ধারণাটিকে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে পুনর্জীবিত করেন এবং তৈরি করেন “Y-জিপার”, যা একটি স্বয়ংক্রিয় ডিজাইন টুল ও ৩ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা যায়; এই জিপার ব্যবহার করে ব্যবহারকারীরা সহজেই এমন বস্তু তৈরি করতে পারেন, যেগুলো প্রয়োজনে নমনীয় থেকে শক্ত বা শক্ত থেকে নমনীয় হয়ে যেতে পারে, ফলে এটি ক্যাম্পিং সরঞ্জাম, চিকিৎসা যন্ত্র, রোবট বা শিল্পকর্মে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে; আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে ব্যবহারকারী জিপারের দৈর্ঘ্য, বাঁক, কোণ এমনকি বন্ধ অবস্থায় তার আকারও নির্ধারণ করতে পারেন, যেমন সোজা, বাঁকা, পেঁচানো বা স্ক্রু আকৃতির নকশা।
এই Y-জিপারের বিশেষত্ব হলো এর “শেপ-শিফটিং” ক্ষমতা; খোলা অবস্থায় এটি দেখতে অনেকটা তিনটি প্রসারিত শুঁড়ওয়ালা স্কুইডের মতো, আর বন্ধ করলে এটি একটি কমপ্যাক্ট দণ্ডের মতো হয়ে যায়; এই বৈশিষ্ট্য ভ্রমণের সময় বিশেষভাবে কার্যকর, যেমন একটি তাঁবু স্থাপন করতে সাধারণত কয়েক মিনিট সময় লাগে, কিন্তু এই জিপার ব্যবহার করলে তা অনেক দ্রুত করা সম্ভব, কারণ জিপারটি নিজেই কাঠামোকে সঠিক অবস্থানে নিয়ে আসে; একইভাবে চিকিৎসাক্ষেত্রে এটি একটি কব্জির প্লাস্টারকে দিনের বেলায় ঢিলা এবং রাতে শক্ত করে ব্যবহার করার সুযোগ দেয়, ফলে রোগীর আরাম ও সুরক্ষা দুটোই নিশ্চিত হয়।
এছাড়াও এই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলমান যন্ত্র তৈরি করতেও সহায়ক, যেমন মোটরের সাথে যুক্ত করলে জিপারটি নিজে থেকেই খুলে বা বন্ধ হয়ে একটি রোবটের আকার পরিবর্তন করতে পারে; উদাহরণ হিসেবে একটি চার পা-ওয়ালা রোবট তার পায়ের দৈর্ঘ্য পরিবর্তন করে অসমতল ভূমিতে সহজে চলাচল করতে পারে; একই সঙ্গে এটি গতিশীল শিল্পকর্ম তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে একটি যান্ত্রিক ফুল জিপারের সাহায্যে ধীরে ধীরে “ফুটে ওঠে”।গবেষকরা এই জিপারের স্থায়িত্ব পরীক্ষা করতে বিভিন্ন পরীক্ষা চালান, যেখানে ৩ডি প্রিন্টিংয়ে ব্যবহৃত দুটি উপাদান, পলিল্যাকটিক অ্যাসিড (PLA) ও থার্মোপ্লাস্টিক পলিইউরেথেন (TPU) পরীক্ষা করা হয়; ফলাফলে দেখা যায় PLA বেশি ভার বহন করতে সক্ষম, আর TPU বেশি নমনীয়। আরও একটি পরীক্ষায় প্রায় ১৮,০০০ বার খোলা-বন্ধ করার পর জিপারটি ভেঙে যায়, যা এর উল্লেখযোগ্য স্থায়িত্বের প্রমাণ; এর স্থিতিস্থাপক গঠনই মূলত চাপকে সমানভাবে বণ্টন করে দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
ভবিষ্যতে গবেষকরা আরও শক্তিশালী উপাদান, যেমন ধাতু ব্যবহার করে এই জিপারকে আরও টেকসই করার পরিকল্পনা করছেন, পাশাপাশি বড় আকারের কাঠামো তৈরির দিকেও কাজ চলছে। সম্ভাব্য ব্যবহারক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে মহাকাশ গবেষণা, যেখানে এই জিপারযুক্ত কাঠামো মহাকাশযানে যুক্ত হয়ে পাথরের নমুনা সংগ্রহ করতে পারে, এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্র বা চিকিৎসা তাঁবু স্থাপনেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে; এই গবেষণাটি ২০২৬ সালের CHI কনফারেন্সে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মানব-কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশন বিষয়ক একটি শীর্ষস্থানীয় বৈজ্ঞানিক সম্মেলন হিসেবে পরিচিত।