নাসার নতুন পরিকল্পনা শুনলে অনেকেই চমকে যান; নাসা এবং স্পেসএক্স এখন শুধু চাঁদে ভ্রমণের কথা ভাবছে না, সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার ছকও কষছে। মঙ্গলে যাওয়ার পরিকল্পনাকে আপাতত পাশে সরিয়ে চাঁদের দিকেই নজর ঘুরেছে। গত ২৪ মার্চ নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান চাঁদে মানুষের স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেন এবং জানান, ২০২৭ সালের মধ্যেই নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে। এর আগে ইলন মাস্কও আগামী এক দশকের মধ্যে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির কথা বলেছেন।
স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা অংশে এসে উত্তেজনার রং কিছুটা ফিকে হয়ে যায়; বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিষয়টি মোটেও সহজ নয়। ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড নাসা গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের সীমান্ত এবং ক্যাটলিন আহরেন্স মনে করেন, আমরা এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নই। সাধারণ মানুষের কাছে ১০ বছর দীর্ঘ সময় হলেও বিজ্ঞানীদের কাছে এটি চোখের পলকের মতো দ্রুত। চাঁদের পরিবেশ অত্যন্ত বৈরী। সেখানে ক্ষুরের মতো ধারালো ও বিদ্যুতায়িত ধুলাবালি রয়েছে, যা হাঁটলেই উড়ে গিয়ে যন্ত্রপাতি, স্পেসস্যুট ও সোলার প্যানেলে আঠার মতো লেগে থাকে এবং মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। অদৃশ্য ঘাতক হিসেবে রয়েছে মহাজাগতিক বিকিরণ। চাঁদে পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডল নেই, ফলে বিকিরণ সরাসরি আঘাত হানে। ইউনিভার্সিটি অফ সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার বন্ধু এমানুয়েল উরকুয়েটা বলেন, এই বিকিরণ ঠেকানো অত্যন্ত কঠিন এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়; ফলে চাঁদে যাওয়া মানুষ এক অর্থে জীবন্ত পরীক্ষার অংশ হয়ে যাবেন।
বাড়ি বানানোর চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিকিরণ ও ধুলাবালি থেকে বাঁচতে মজবুত কাঠামো দরকার। বিজ্ঞানীরা কাঁচের গম্বুজ, ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি কিংবা চাঁদের মাটি দিয়ে থ্রিডি প্রিন্ট করা বাড়ির কথা ভাবছেন; তবে বাস্তবে কীভাবে এগুলো নির্মাণ করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মাটির নিচে থাকা সবচেয়ে নিরাপদ মনে হলেও, চাঁদের বুকে কার্যকরভাবে খনন প্রযুক্তি এখনো পরীক্ষিত নয়।মধ্যাকর্ষণের অভাব মানবদেহের জন্য আরেকটি বড় বাঁধা। চাঁদের অভিকর্ষ পৃথিবীর ছয় ভাগের এক ভাগ। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীরা ভারী ট্রেডমিলে ব্যায়াম করে শরীর সুস্থ রাখেন, কিন্তু চাঁদে এমন যন্ত্র বহন করা কঠিন।
কম অভিকর্ষের কারণে শরীরের তরল উপরের দিকে সরে গিয়ে চোখ, মস্তিষ্ক ও রক্তনালিতে বিপজ্জনক সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবুও আশার আলো নিভে যায়নি; আর্টেমিস প্রোগ্রামের মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে মানুষ আবার চাঁদে ফিরতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। চাঁদের বরফকে কেন্দ্র করে বড় আশা রয়েছে, কারণ এটি পানি, জ্বালানি ও সম্পদের উৎস হতে পারে; তবে এখনো এর সরাসরি নমুনা হাতে আসেনি। মুন ভিলেজ অ্যাসোসিয়েশন-এর জিউসেপ্পে রেইবাল্ডি সতর্ক করে বলেছেন, বাস্তবতার সীমা না বুঝে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়া ঠিক নয়।
সব মিলিয়ে চাঁদে বসতি গড়া যেন এক মহাজাগতিক দাবার খেলা; চালগুলো সাজানো হচ্ছে, কিন্তু চেকমেট আসতে এখনো সময় বাকি। আগামী ১০ বছরে মানুষ চাঁদে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করতে পারলেও পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠা সম্ভবত আরও দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা চাইবে। তবুও সেই দিনের জন্য বিজ্ঞানীদের নিরন্তর প্রস্তুতি এক অনন্য অভিযানের গল্প লিখে চলেছে।